ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

 ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদেনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।তার বাবর নাম ঠাকুরচাদ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা ভগবতী দেবী।তার পারিবারিক নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আর ‘বিদ্যাসাগর’ তাঁর উপাধি।তবে দিন স্বাক্ষর করতেন ‘ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা’।

তিনি গ্রামের পাঠশালা শেষ করে কলকাতার সরকারি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। এখানে তিনি বারো বছর অধ্যয়ন করেন। ১৮৩৯ সালে ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায় ও জ্যোতিষ শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করেন। কলকাতা সংস্কৃত কলেজ তাকে একই বছর ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি দেন।

তিনি ছিলেন একাধারে সমাজসংস্কারক, লেখক ও শিক্ষাবিদ। সমাজসংস্কারক হিসেবে তিনি হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহের প্রচলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।তাঁর প্রচেষ্টায় ২৬ জুলাই ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়।তিনি তাঁর পুত্র নারায়নচন্দ্রকে ১৮৭০ সালে নিকটাত্মীয় বিধবা বিবাহ করান। এছাড়াও কলকাতায় নারী শিক্ষামন্দির ‘বেথুন কলেজ’ তাঁর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

তিনি ১৮৪১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের হেড-পন্ডিত বা সেরেস্তাদার হিসেবে নিযুক্ত হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৮৪৬ সালের ৬ এপ্রিল সংস্কৃত কলেজে যোগ দিয়ে এখান থেকে অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

 

বাংলা গদ্যরীতি প্রচলনে অবিস্মরনীয় অবদান রাখার জন্য বিদ্যাসাগরকে ‘বাংলা গদ্যের জনক’ বলা হয়।১৮৪৭ সালে বাংলা সাহিত্যে দাঁড়ি, কমা, কোলন প্রভৃতি বিরাম চিহৃ তিনি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন। তাঁকে বাংলা সাহিত্যে বিরাম বা যতিচিহ্নের প্রবর্তক বলা হয়।২০০৪ সালের বিবিসি জরিপে তাঁর অবস্থান ছিলো ৮ম।রবীন্দ্রনাথ তাকে বাংলা গদ্যের‘প্রথম শিল্পী’ বলে অভিহিত করেন। ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

সাহিত্যজীবন

 

অনুবাদগ্রন্থ

বেতাল পঞ্চবিংশতি: ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত বিদ্যাসাগরের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ।এটি হিন্দি ‘বৈতাল পচ্চিসী’র অনুবাদ।ঈশ্বরচন্দ্রের এই গ্রন্থের দশম সংস্করনে সর্বপ্রথম যতি চিহ্নের সফল প্রয়োগ হয়।গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা হয়।

ভ্রান্তিবিলাস: শেক্সপীয়রের ‘Comedy of errors’ এর বাংলা রূপ ‘ভ্রান্তিবিলাস’।

সীতার বনবাস:ভবভূতির উত্তরামচরিত নাটকের প্রথম অঙ্ক এবং বাল্মীকির রামায়নের উত্তর কান্ডের বঙ্গানুবাদ এটি।

শকুন্তলা: কালিদাসের সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নাটক অবলম্বনে ১৮৫৪ সালে ঈশ্বরচন্দ্র একটি আখ্যান বা উপন্যাসোপম কাহিনী লিখেন যার নাম দেন ‘শকুন্তলা’। শকুন্তলার পিতার নাম মহর্ষি বিশ্বমিত্র।‘একি শরীরের রূপ, নাকি রূপের শরীর’ –রাজা দুষ্মন্তের উক্তি।

 

মৌলিক গ্রন্থ

 

প্রভাবতী সম্ভাষণ: ১৮৯২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক গ্রন্থ।মূলত এটি একটি শোকগাথা।তাঁর বন্ধুর মেয়ের মৃত্যুতে এটি রচনা করেন।

বিদ্যাসাগর চরিত/আত্মচরিত: বাংলা গদ্যে প্রথম আত্মচরিত গ্রন্থ।

ব্রজবিলাস: এটি তার একটি রম্য রচনা। এতে তার ছদ্মনাম ছিলো ‘কবিকুল তিলকস্য কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’।

‘অতি অল্প হইল’ এবং ‘আবার অতি অল্প হইল’ এই দুটিও তাঁর রম্য রচনা। এগুলোতেও তাঁর ছদ্মনাম ছিল ‘কস্যাচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’।

কস্যাচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য নামে আরো দুইটি মৌলিক রচনা রয়েছে বিদ্যাসাগরের। এগুলো হলো ‘বিধবা বিবাহ ও যশোরের হিন্দু ধর্মরক্ষিণী সভা’ এবং ‘রত্ন পরীক্ষা’।

 

পাঠ্যবই

জনশিক্ষা ও শিশুশিক্ষার জন্য তাঁর রচিত গ্রন্থগুলা হল- বোধোদয়, বর্ণপরিচয় ১ম ও ২য় ভাগ, কথামালা, আখ্যান মঞ্জুরী, ব্যাকরণ কৌমুদী এবং শব্দমঞ্জুরী।

বর্ণপরিচয়: এটি ক্লাসিকের মর্যাদা লাভ করে।

শব্দমঞ্জুরী হল একটি বাঙ্গালা অভিধান।