জসীমউদ্দীন

জসীমউদ্দীন

 

পল্লী কবি হিসেবে পরিচিত জসীম উদদীন ১লা জানুয়ারি ১৯০৩ সালে ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তার মাতার নাম আমেনা খাতুন ও পিতার নাম মৌলবি আনসার উদদীন আহমদ। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফরিদপুরের গোবিন্দপুর গ্রাম। তাঁর উপাধি ‘পল্লীকবি’।তিনি সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সমর্থক ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ৩১ মার্চ তিনি ঢাকায় পরলোকগমণ করেন। তাঁকে ১৪ই মার্চ ফরিদপুরের আম্বিকাপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়।

১৯৩১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।তিনি ড. দীনেশচন্দ্র সেনের আনুকূলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লীগীতি সংগ্রাহক পদে নিযুক্তি লাভ করেন।১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচার পদে তিনি নিযুক্ত হন। তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয়।

বিশ্বভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ‘ডি-লিট’ পুরস্কার প্রদান করেন।১৯৭৬ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য ‘একুশে পুরস্কার’ লাভ করেন।

 

সাহিত্য

 

কাব্যগ্রন্থ

তাঁর কাব্যগ্রন্থ হল – রাখালী, নকশী কাঁথার মাঠ, বালু চর, ধানক্ষেত, সোজন বাদিয়ার ঘাট, রঙিলা নায়ের মাঝি, হাসু, রুপবতি, মাটির কান্না, এক পয়সার বাঁশী, সকিনা, সুচয়নী, মা যে জননী কান্দে, হলুদ বরণী, জলে লেখন, কাফনের মিছিল, ভয়াবহ সেই দিনগুলি, মহরম, দুমুখো চাঁদ পাহাড়ি।

 

রাখালি (১৯২৭): এটি কবির প্রথম গ্রন্থ বা কাব্যগ্রন্থ।এর উল্লেখযোগ্য কবিতা- রাখালী, ছেলে, কবর, পল্লী জননী প্রভৃতি।

 

রাখালী

 

রাখাল ছেলে

সেই ঘরেতে একলা ডাকছে আমার মা।

……………………………….

এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাঠির তলে,

গড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জল।

 

কবর

এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম –গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

 

……………………………………….

বাপের বাড়িতে যাইবার কালে কহিত ধরিয়া পা,

আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।

……………………………..

আমারে ছাড়িয়া এত ব্যাথা যার কেম করিয়া হায়,

কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালায়!

 

ছাত্রাবস্থায় ‘কবর’ কবিতাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্য তালিকাভুক্ত হয়।কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। এর পক্তির সংখ্যা ১১৮টি। প্রথম ‘কবর’ কবিতাটি ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রিয়জন হারানোর মর্মান্তিক স্মৃতিচারণ কবিতাটির বিষয়বস্ত্তু।কবিতায় দাদু শাপলার হাটে তরমুজ বিক্রি করতেন।

 

পল্লী জননী

 

পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেল;

আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।

 

নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯): নকশী কাঁথার মাঠ কবির শ্রেষ্ঠ কাহিনীকাব্য।প্রচলিত পল্লীগীতিকার ব্যতিক্রমী এই রচনাটিতে তিনি কাহিনীর আবর্তনে অসম্ভব দক্ষতার পরিচয় দেয়।গ্রন্থটির ইংরেজী ‘অনুবাদের নাম ‘Field of the Embroidery Quilt’। এর অনুবাদক E M Milford.

‘কাঁচা ধানের পাতার মত কচি মুখের মায়া’ এবং ‘জালি লাউয়ের ডগার মতোন বাহু দু’খান সরু’- পক্তি দুটি জসীমউদদীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যের নায়ক রূপাই সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই কাব্যের প্রথম অংশে আছে রূপা ও পাশের গ্রামের মেয়ে সাজুর প্রথম পরিচয় থেকে তাদের অনুরাগের বিকাশ ও বিবাহ এবং কয়েকমাসের সুখময় জীবনের কথা। দ্বিতীয় অংশের বিষয় হচ্ছে তাদের বিচ্ছেদ।

 

ধানক্ষেত: এই গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘নিমন্ত্রণ’। এ কবিতায় কবি তাঁর বন্ধুকে কাজল গাঁয়ে নিমন্ত্রন দেয়। 

 

এক পয়সার বাঁশী: এটি একটি শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ।এর উল্লেখ যোগ্য কবিতা-

 

আসমানী

আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,

রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।

……………

মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি,

থাপড়েতে নিভিয়ে গেছে দারুন অভাব আসি।

 

আসমানির বাড়ি ফরিদপুর জেলায়।

 

বালুচর: বালুচর গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কবিতা মুসাফির।

 

সুয়চনী: রবীন্দ্রনাথের যেমন ‘সঞ্চয়িতা’, নজরুলের ‘সঞ্চিত’, জসীম উদ্দীনের তেম ‘সুয়চনী’।এটি কবির নির্বাচিত কবিতার সংকলন।

মাটির কান্না: উল্লেখযোগ্য কবিতা-

কবিতা

 

চাষার ছেলে, খেলোয়ার, মাটির কান্না, রূপবতী, মা যে জননী কান্দে।

নাটক

তার বিখ্যাত নাটকসমূহ – বেদের মেয়ে (গীতিনাট্য), পদ্মাপাড়, পল্লীবধূ, মধুমালা, গ্রামের মায়া।

 

উপন্যাস

তাঁর রচিত একমাত্র উপন্যাস ‘বোবা কাহিনী’। এটি ১৯৬৪ সালে রচনা করেন।উল্লেখযোগ্য চরিত্র- বছির, আজহার, আরজান, রহিমুদ্দিন।

 

শিশুতোষ

হাসু, এক পয়সাঁর বাঁশী ও ডালিমকুমার।

 

ভ্রমণকাহিনী

 

চলে মুসাফির, হলদে পরীর দেশ, যে দেশে মানুষ বড়।

 

গানের সংকলন

 

তাঁর গানের সংকলন গুলো- রঙিলা নায়ের মাঝি, গাঙ্গের পাড়, জারিগান।

 

তাঁর রচিত বিখ্যাত জনপ্রিয় হাস্যরসাত্মক বইয়ের নাম ‘বাঙালির হাসির গল্প’।

 

আত্মজীবনী

জীবনকথা, ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়।

 

উল্লেখযোগ্য পক্তি:

১. কপোল ভাসিয়া যায় নয়নের জলে।(কাল সে আসিয়াছিল)

২. বাশরি আমার হারিয়ে গেছে বালুর চরে,

   কেমনে পশবি গোধন লইয়া গোয়াল ঘরে। (বাশরি আমার হারিয়ে গেছে)।