পাকিস্থান শাসন

পাকিস্থান আমল

 

 

পাকিস্থানের প্রথম

 

পাকিস্থানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহামম্মদ আলী জিন্নাহ

পাকিস্থানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান

পূর্ব বাংলার প্রথম মূখ্য মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন

 

আওয়ালী মুসলিম লীগ

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।আর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আওয়ালী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক। ১৯৫৫ সালে আওয়ালী মুসলিম লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ালী লীগ’ নামকরণ করে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য এর দ্বার উন্মুক্ত করা হয়।

 

পূর্ববঙ্গ জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০

গণদাবির কারনে মুসলিম লীগ সরকার ১৯৪৮ সালের ৩১ মার্চ পূর্ববঙ্গ  জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্ব বিল উপস্থাপ করে। বহু বির্তকের পর ১৯৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে বিলটি আইনে পরিণত হয়। এ আইনের ফলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়।

 

কোয়ালিশন সরকার

১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকরে দায়িত্ব পান এবং যুক্তফ্রন্টে যোগ দিয়ে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালের মন্ত্রিসভায় তিনি কৃষি মন্ত্রী হন। বঙ্গবন্ধু ১৯৫৬ সালে কোয়লিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন।

 

ভাষা আন্দোলন

  • ১৯০১ সালে রংপুরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক শিক্ষা সম্মেলনে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বাংলা ভাষাকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকারের আহ্বান জানান।
  • পাকিস্থানের জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।
  • অন্যদিকে সমগ্র পাকিস্থানের জনসংখ্যার শতকরা ৬ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা ছিল উর্দু।
  • ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় জনাব তাসাদ্দুক হোসেন সভাপতিত্বে পূর্বপাকিস্থান যুবকর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই প্রথম ফূর্ব পাকিস্থানের অফিস ও আইন আদালতের ভাষা এবং শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলাকে চালু করার দাবি জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
  • ১৯৪৭ সালে ড. মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ ‘দৈনিক আজদ’ পত্রিকায় ‘পাকিস্থানের ভাষা সমস্যা’ শিরোনামে বাংলাকে পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষার দাবি করেন।
  • ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বরে করাচিতে একটি শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্থানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি করা হয়।

 

 

তমদ্দুন মজলিশ

১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ‘তমদ্দুন মজলিশ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়।‘তমদ্দুন মজলিশ’ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম। পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে চালু করার দাবি নিয়ে এগিয়ে আসে ‘তমদ্দুন মজলিশ’। তমদ্দুন মজলিশ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এর তিনজন লেখক ছিলেন -অধ্যাপক আবুল কাসেম, ড. কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবুল মনসুর আহমদ।এটা ছিল আন্দোলনের প্রথম প্রবন্থ বা পুস্তিকা। এর তিনজন লেখকই ছিলেন ‘তমদ্দুন মজলিশ’ এর প্রতিষবঠাতা সদস্য।

১৯৪৮ সালের সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার উদ্দ্যেশে ঢাকায় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।

 

পাকিস্থানের গণপরিষদ

১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট পাকিস্থানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের এক অধিবেশনে ‘ইংরেজির পাশাপাশি উর্দু ভাষাতে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হলে পূর্ব বাংলার গণপরিষদ সদস্য কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এর প্রতিবাদ করেন এবং বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষারূপে সরকারি স্বীকৃতি দাবি জানান। কিন্তু গণপরিষদ দাবি প্রত্যাখান করলে পূর্ব বাংলা ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী মহলে অসন্তোষ দেখা দেয়।

 

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ

১৯৪৮ সালের ২ মার্চ কামরুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এই সংগ্রাম পরিষদ রাষ্ট্রভাষার ক্ষেত্রে সরকারের ষড়যন্ত্র রোধ করার জন্য ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই দিন ঢাকায় বহু ছাত্র আহত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, অলি আহাদ, শামসুল আলমসহ আরোও অনেক ছাত্র নেতা গ্রেফতার হন। এজন্য ১৯৪৮-১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময়কালে প্রতিবছর ১১ মার্চ ‘ভাষা দিবস’ পালন করা হত। ১৫ই মার্চ আন্দোলনের মুখে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য ছাত্রনেতাকরে মুক্তি দেওয়া হয় এবং খাজা নাজিমউদ্দিন ছাত্রদের সাথে আট দফা চুক্তি করতে বাধ্য হন।ফলে আন্দোলন কিছুটা স্থিমিত হয়।

  • ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় ঘোষনা দে, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা’। ২৪ মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করলে উপস্থিত ছাত্ররা ‘না না’ বলে তীব্র প্রতিবাদ করে।
  • ১৯৪৯ সালে পূর্ব বাংলা সরকার বাংলা ভাষা সংস্কারের নামে ‘পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি’ গঠন করে। মওলানা আকরাম খাঁ ছিলেন এ কমিটির সভাপতি। এই কমিটি ১৯৫০ সালে রিপোর্ট প্রদান করে। এত উর্দুকে পূর্ব বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় ভাষা রূপে পাঠ করানোর সুপারিশ করা হয়।
  • ১৯৫০ সালে পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঘোষনা করেন, ‘উর্দুই পাকিস্থানের জাতীয় ভাষা হবে’। ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হলে খাজা নাজিমউদ্দিন পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
  • ১৯৫১ সালে ভাষা সৈনিক মতিনের নেতৃত্বে গীঠত হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি’।
  • ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্থানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঢাকায় এক জনসভায় ঘোষনা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা’।
  • পাকিস্থানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঐ দিনই অর্থাৎ ২৬ জানুয়ারি আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহবায়ক করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কমিটি’ গঠন করা হয়।

 

ভাষা আন্দোলন -১৯৫২

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কমিটি’ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রোজ বৃহস্পতিবার ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সারাদেশে হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ছাত্র আন্দোলনের ভয়ে ভীত হয়ে নুরুল আমিন সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে এভং সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সংগঠিতভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিতে দিতে বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে সমবেত হয়্ পুলিশ উপস্থিত ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করলে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ এক পর্যায়ে গুলি বর্ষণ করলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার এবং ঐতিহাসিক এ দিনটির বাংলা তারিখ ৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৮।

  • ২১ ফেব্রুয়ারিতেই শহীদদের স্মরণে রাজশাহী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গনে ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মিনার স্থাপিত হয়।

পুলিশের গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়। এ শোভাযাত্রার উপরও পুলিশ গুলি বর্ষণ করে। ফলে শফিউর রহমান মৃত্যুবরণ করেন।

  • ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমউদ্দিন এবং পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন নুরুল আমিন।
  • ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্থানের গর্ভণর ছিলেন মালিক মোহাম্মদ ফিরোজ খান নুন।

১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গনে স্থাপিত হয় ঢাকার প্রথম শহীদ মিনার। ডা. বদরুল আলম এবং ডা. সাঈদ হায়দার এর নকশাঁ আঁকেন। এই শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা। ২৬ তারিখ সাহিত্যিক আবুল কালাম পুনরায় উদ্বোধন করেন।ঐ রাতেই শহীদ মিনারটি মুসলীম লীগ কর্মীরা ভেঙ্গে দেয়। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে বা সংবিধানে বাংলাকে পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদান করা হয়।

 

বাংলা পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায় ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬। এদিন পাকিস্থানের গণপরিষদের ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্থানের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়। এ সংবিধানে ২৪১(১) অনুচ্ছেদে বলা হয় “পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং বাংলা।” ২৩ মার্চ ১৯৫৬ সালে এ সংবিধান কার্যকর হয়।

 

  • ভাষা শহীদ আবুল বরকত ১৯২৭ সালে মুর্শিদাবাদ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গনে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হন। ভাষার জন্য আত্মদানের জন্য তাকে ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন।
  • ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রথম গান রচনা করেন অধ্যাপক আনিসুল হক চৌধুরী। গানটির সুর করেন শেখ লৎফর রহমান।
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ চট্টগ্রামের মাহবুবুল আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ নামে ১৬ পৃষ্ঠার কবিতা রচনা করেন। এটি ছিল একুশের প্রথম কবিতা।
  • ভাষা সংগ্রামী গাজীউল হক রচনা করেন ‘ভুলবো না, ভুলবো না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলবো না’। সুর করেন নিজামুল হক। এটি একুশের প্রথম গান।
  • ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ ছিল ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র।১৯৪৮ সালে অধ্যাপক সাহেদ আলীর সম্পাদনায় প্রকাশ শুরু হয়। পাকিস্থানের গণপরিষদে প্রথম বাংলায় বক্তৃতা দেন মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ।
  • বাংলাদেশের বাহিরে ভাষা আন্দোলন: ১৯৬১ সালের ১৯ মে বাংলা ভাষার দাবিতে আসামের কাছাড় জেলার ভাষা আন্দোলন সংঘঠিত হয়। পুলিশ গুলি চালালে ১১ জন মারা যায়। ১৯ মে আসামে রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয়। ১৯৬১ সালেই অসমীয় ভাষার পাশাপাশি বাংলাকেও আসামের সরকারি ভাষা ঘোষনা করা হয়।
  • ১৯৯৭ সালে বৃটেনের ওল্ডহ্যাম শহরে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এটি ছিল দেশের বাহিরে প্রথম শহীদ মিনার।

 

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

  • ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়।
  • ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো তাঁর ৩১ তম বৈঠকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষনা করেন। ২০০০ সালে প্রথমবারের মত বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
  • জাতিসংঘ ২০০৮ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
  • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ছবি সম্বলিত ডাক টিকেট প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র।
  • ভাষাভাষী জনসংখ্যার বিবেচনায় বাংলা ভাষার অবস্থান বিশ্বে বাংলা পিডিয়ার মতে সপ্তম এবং মাধ্যমিক ব্যাকরণ বইয়ের সূত্রমতে ৪র্থ।
  • বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়েছে সিয়েরা লিয়ন।
  • বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরের ব্যবহারের জন্য জাতীয় সংসদে আইন পাস হয় ১৯৮৭ সালে।
  • সরকারি ভাষা হিসেবে এদেশে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার শুরু হয় ১৮৩৫ সালে।
  • ১৯৭৫ সালের ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাকে রাষ্ট্র ও জাতীয় ভাষা ঘোষনা করেন। আদেশে বলা হয় সরকারি, স্বায়ত্তশাসিতও আধা সরকারি অফিসে বাংলায় নথি ও চিঠিপত্র লিখতে হবে।

 

 

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট

নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্থানে মুসলিম লীগকে চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর সমমনা কয়েকটি বিরোধীদল ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামে একটি ঐক্যজোট গঠন করে। যুক্তফ্রন্ট মূলত ৪টি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। এগুলো হল:

১. মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ

২. এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমীক পার্টি

৩. মওলানা আতাহার আলীর নেতৃত্বাধীন নেজাম-ই-ইসলামী

৪. হাজী দানেশের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী গণতন্ত্রী দল

নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রতীক ছিল নৌকা এবং ২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।২১ দফা দাবির প্রথম দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। অন্যান্য উল্লেখ্যযোগ্য দফাগুলো হল:

২নং: বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ ও খাজনা আদায়কারী মধ্যস্বত্ব ভোগীদের উচ্ছেদ করে ভূমিহীন কৃষকদেরমধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বন্টনেরব্যবস্থা করা।

৩নং: পাট ব্যবসায়ে জাতীয়করণ ও পাটের ন্যায্যমূল্য প্রদান।

৫নং: পূর্ব বাংলাকে লবনের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।

৯নং: অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন ও শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করা।

১০নং: সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ব্যবধান দূর করা এবং বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করা।

১১নং: বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত সকল কালাকানুন বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন প্রদান করা।

১৫নং: শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা।

১৬নং: বর্ধমান হাউজকে (বর্তমান বাংলা একাডেমী) আপাতত ছাত্রাবাস এবং পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে গবেষণাগার করা।

১৭নং: বাংলা ভাষার জন্য শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করা।

১৮নং: একুশে ফেব্রুয়ারিবে শহীদ দিবস ও সরকারি ছটির দিন হিসাবে পালন করা

  • ২১ দফা কর্মসূচি বা মেনিফেস্টো প্রণয়ন করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ এর সহসভাপতি আবুল মনসুর আহমেদ। ২১ দফা মেনিফেস্টোতে ভাষা সম্পর্কিত দফা ছিল ৫টি (১,১০,১৬,১৭ ও ১৮)
  • ১৯৫৪ সালের ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্থানের প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে পূর্ববাংলা আইন পরিষদের মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩০৯টি। এর মধ্যে মুসলিম আসন ছিল ২৩৭টি এবং অমুসলিম সম্প্রদায়ের আসন ছিল ৭২ টি। মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩ টি আসন এবং মুসলিম লীগ ৯টি আসন লাভ করে। অমুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত ৭২টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ১৩টি আসন লাভ করে। অর্থাৎ মোট ৩০৯ আসন বিশিষ্ট প্রাদেশিক আইন সভায় যুক্তফ্রন্ট ২৩৬টি আসন লাভ করে। ১৯৫৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রাদেশিক নির্বাচনের পর যুক্তফ্রন্ট পূর্ববাংলায় মন্ত্রিসভা গঠন করে। মন্ত্রিসভার মূখ্যমন্ত্রী হন এ কে ফজলুল হক। শেখ মুজিব এই মন্ত্রিসভায় কৃষি, সমবায়, পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পাকিস্থানের তৎকালীন গভর্নর গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৪ সালের ৩০ মে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে ফজলুল হকের ‘যুক্তফ্রন্ট’ মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রের শাসন জারি করে।

 

পাকিস্থানের প্রথম শাসনতন্ত্র

পাকিস্থানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচিত হয় ১৯৫৬ সালে। এ শাসনতন্ত্রের মাধ্যমে পাকিস্থান ইসলামী প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোকে একত্রিত করে একটি ইউনিট গঠনের ফলে এর নাম হয় ‘পশ্চিম পাকিস্থান’ এবং পূর্ব বাংলার নাম হয় ‘পূর্ব পাকিস্থান’। পাকিস্থান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন ইস্কান্দার মির্জা।

 

কাগমারী সম্মেলন

১৯৫৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষে একটি ঐতিহাসিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যা ‘কাগমারী সম্মেলন’ নামে পরিচিত। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং প্রধান অথিতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হোসেন সোহরাওয়ার্দী। সম্মেলনের প্রধান এজেন্ডা ছিল পূর্ব পাকিস্থানের স্বায়ত্তশাসন ও বৈদেশিক নীতি। অনুষ্ঠানে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্থানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন বলেন, যদি পূর্বপাকিস্থানের শোষণ অব্যাহত থাকে তবে তিনি পশ্চিম পাকিস্থাকে ‘আসসালামুআলাইকুম’ জানাতে বাধ্য হবেন।

 

সামরিক শাসন

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর এক ঘোষনাবলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক শাসন জারি করেন। তিনি প্রধান সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। মাত্র ২০ দিনের মাথায় আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং দেশত্যাগে বাধ্য করেন। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান নিজেকে পাকিস্থানের স্বনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসাবে ঘোষণা করেন। একই সাথে তিনি পাকিস্থানের প্রধান সেনাপতি ও সামরিক শাসকের পদেও বহাল থাকেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬০ সালের ২৩ মার্চ সামরিক শাসন প্রত্যাহার করেন।

 

মৌলিক গণতন্ত্র

জেনারেল আইয়ুব খান ছিলে উচ্চভিলাষী। প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হয়েই নিজের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভিত্তি সুদৃঢ় ও সুনিশ্চিত করার জন্য তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালের ২৭ অক্টোবর ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক একবছর পরে তিনি ‘মৌলিক গণতন্ত্র অধ্যাদেশ’ জারি করেন। এই আদেশ বলে তিনি যে স্থানীয় সরকারের পরিকল্পনা করেন তার নামকরণ করেন ‘মৌলিক গণতন্ত্র’। মৌলিক গণতন্ত্র অধ্যাদেশে ৪ স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন গড়ে তোলার কথা বলা হয়। প্রথম স্তরে ছিল গ্রামে ‘ইউনিয়ন কাউন্সিল’, পৌর এলাকায় ‘ইউনিয়ন কমিটি’ এবং ছোট শহরে ‘টাউন কমিটি’। ২য় স্তরে ছিল গ্রামে থানা কাউন্সিল, পৌর এলাকায় ‘মিউনিসিপ্যাল কমিটি’ সামরিক এলাকায় ‘ক্যান্টমেন্ট বোর্ড’। ৩য় স্তরে ছিল ‘জেলা কাউন্সি ‘ এবং ৪র্থ স্তরে  ছিল ‘বিভাগীয় কাউন্সিল’।

পূর্ব পাকিস্থানের ৪০ হাজার এবং পশ্চিম পাকিস্থানের ৪০ হাজার ‘মৌলিক গণতন্ত্রী সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন বলে বিধান করা হয়। এই মৌলিক গণতন্ত্রীদের ভোটেই ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, আইন সভার সদস্য ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রাখা হয়। ১৯৬০ সালের এক সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সারাদেশে ৮০ হাজার গণতন্ত্রীর আস্থাসূচক (‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট) জেনারেল আইয়ুব খান পাঁচ বছরের জন্যপাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। এই মৌলিক গণতন্ত্রীদের সমর্থনের জোরেই আইয়ুব খান তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে সূদৃঢ় করতে সক্ষম হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ পর্যদস্ত হয়ে পড়ে। নির্বাচনে অন্যকোন প্রার্থীর থাকার প্রশ্নই উঠে না। কেননা এটা ছিল আস্থা যাচাইয়ের ভোট। এ প্রহসনমূলক নির্বাচনের আইয়ুব খান শতকরা ৯৫.৬২ ভাগ ভোট লাভ করে।

 

পাকিস্থানের দ্বিতীয় শাসনতন্ত্র

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের শাসনামলে ১৯৬২ সালে পাকিস্থানের দ্বিতীয় সংবিধান প্রণীত হয়।এই সংবিধানে পাকিস্থানকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসাবে ঘোষনা করা হয়। বঙ্গবন্ধুসহ  আওয়ামী লীগের ১৩ জন সদস্য উক্ত সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। কারণ পূর্ব বাংলার নাম রাখা হয়্ ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইস্ট পাকিস্থান।’ সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময়ে পাকিস্থানের রাজধানী করাচি থেকে ইসলামাবাদ স্থানান্তর করা হয়।

শরীফ শিক্ষা কমিশন

৩০ ডিসেম্বর, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান পাকিস্থানের শিক্ষা সচিব এস.এম. শরীফকে চেয়ারম্যান করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট যে কমিশন গঠিত করে তাকে শরীফ শিক্ষা কমিশন বলে।

  • ১৯৬২ সালে এই কমিশন রিপোর্ট দেয়। এই রিপোর্টে বলা হয় “শিক্ষা এমন কোন জিনিস নয় যা বিনামূল্যে পাওয়া যেতে পারে।”
  • শরীফ শিক্ষা কমিশনের সুপারিশসমূহ হলো:

১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মোট ব্যয়ের ৬০% আসবে ছাত্রদের বেতন থেকে, ২০% আসবে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।

২. ৬ষ্ঠ থেকে ডিগ্রিী পর্যন্ত ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক করা।

৩. উর্দুকে মুষ্টিমেয় লোকের পরিবর্তে জনগণের ভাষায় পরিণত করতে হবে।

৪. পাকিস্থানের জন্য অভিন্ন বর্ণমালায় ব্যবস্থা করা।

 

হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনরে বিরুদ্ধে আন্দোলন

ছাত্ররা ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গণতান্ত্রিক শিক্ষার দাবিতে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনরে বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং স্বৈরাচার আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী হরতাল পালন করে। এটাই ছিল স্বৈরাচার আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রথম গণঅভ্যুত্থান।

 

১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেন এবং নিজে কনভেনশন মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন। এমতাবস্থায় অধিকাংশ বিরোধী দল মিলিত হয়ে COP (Combined Opposition Party) নামে একটি সম্মিলিত জোট গঠন করে। এ জোটের প্রার্থী ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাগনী ফাতেমা জিন্নাহ।এ নির্বাচনে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্রী পন্থায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

 

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত-পাকিস্থান সর্ম্পকের অবনতি ঘটে। ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হয় পাক-ভারত যুদ্ধ। ১৭ দিন ব্যাপী এ যুদ্ধে বাঙালী সৈন্যরা অসম্ভব সাহসিকতা দেখায়। অতঃপর জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে উভয়পক্ষের যুদ্ধবিরতি হয়।

 

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক পূর্ব বাংলার গভর্নর

১৯৫৬ সালের ২৪ মার্চ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক পূর্ব বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। (অপসারিত হন ৪ এপ্রিল ১৯৫৮)। এছাড়াও তিনি অভিক্ত বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুণাবলি ও প্রগাঢ় জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘ডক্টন অব ল’ ডিগ্রি প্রদান করেন।

ছয়-দফা আন্দোলন, ১৯৬৬

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্থানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষার দাবি স্বিলিত একটি কর্মসূচি ঘোষনা করেন। ইতিহাসে এটি ৬ দফা কর্মসূচি নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ২৩ মার্চ, ১৯৬৬ সালে লাহোরের এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ছয় দফা কর্মসূচি ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ এর ভিত্তিতে রচিত। ছয় দফা দাবির প্রথম দাবিটি ছিল পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন। ছয় দফা দাবির দফাগুলো নিম্নরূপ:

১. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্থানকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করতে হবে। এটি সংসদীয় পদ্ধতির যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা হবে। প্রাপ্ত বয়স্কদের সাবজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভা হবে সার্বভৌম।

২. ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়। অন্যান্য বিষয় থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে।

৩. দেশের দুই অঞ্চলেল জন্য সহজে বিনিময়যোগ্য দুটি মুদ্রা চালু থাকবে। মুদ্রা লেনদেনের হিসাব রাখার জন্য দুই অঞ্চলের জন্য দুইটি স্বতন্ত্র স্টেট ব্যাংক থাকবে। মুদ্রা ও ব্যাংক পরিচালনার ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে অথবা দুই অঞ্চলের একই মুদ্রা থাকবে তবে সংবিধানে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে এক অঞ্চলের মুদ্রা ও মূলধন অন্য অঞ্চলে পাচার হতে না পারে। একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং দুটি আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।

৪. সর্বপ্রকার কর ও শুল্ক ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে। আদায়কৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডারেল সরকার ব্যয় নির্বাহ করবে।

৫. বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রদেশগুলোর হাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তবে আয় হতে একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডারেল সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা মিটাতে দেয়া হবে।

৬. প্রদেশগুলো চাইলে তাদের আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নিজস্ব মিলিশিয়া বা আধা সামরিক বাহিনী গঠন ও পরিচালনা করতে পারবে।

 

ছয়দফা দাবি কর্মসূচি বাঙ্গালী জাতির ‘মুক্তির সনদ’ বা ‘ম্যাগনাকার্টা’ হিসাবে পরিচিত। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তি ও ছয় দফা দাবিতে পূর্ব পাকিস্থানে হরতাল পালিত হয়। এই দিন তেজগাঁও এলাকায় পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নেতা মনু মিয়া নিহত হন। তিনি ছয় দফা আন্দোলনের প্রধম শহীদ। এ কারণে ৭ জুন কে ছয় দফা দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান

পাকিস্থান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্থানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্থানিদের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছিল। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড রুদ্ধ করার জন্য পশ্চিম পাকিস্থান সরকার বার বার তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছিল। তারপরও বঙ্গবন্ধুকে এ ভূখন্ড স্বাধীন করার প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখা যায়নি। বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুর সাথে নানা শোর বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর তরুণ বাঙ্গালী সদস্যদের যোগাযোগ ছিল। ১৯৬২ সালে পাকিস্থান নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন একদল সেনা সদস্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। তাদের সাথে বঙ্গবন্ধুর সশস্ত্র আন্দোলন নিয়ে মতবিনিময় হয়। ১৯৬৩ সালে বঙ্গবন্ধু গোপনে ত্রিপুরা যান। সেখানে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় তৎকালীন কংগ্রেস নেতা ও পরবর্তীকালে ত্রিপুরার মূখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের সাথে তাঁর বৈঠক হয়। সেখানে তিনি শচীন্দ্রলাল এর মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে বার্তা পাঠিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনে সহযোগিতা কামনা করেন।এদিকে সামরিক বাহিনীতে বিদ্যমান বৈষ্যমের কারণে কয়েকজন বাঙ্গালী অফিসার ও সেনা সদস্য গোপনে সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য সংগঠিত হতে থাকে। কিন্তু পাকিস্থান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ে। সারা পাকিস্থানে দেড় হাজার বাঙ্গালীকে গ্রেফতার করা হয়।

এ ষড়যন্ত্রের জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি হিসেবে করে অভিযুক্ত করা হয়। তখন বঙ্গবন্ধু জেলে বন্দি ছিলেন। এ মামলাটি দায়ের করা হয় ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠক হয়। সেখানে ভারতের সহায়তায় সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্থানকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা করা হয়। এ জন্য মামলাটির নাম হয় ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। সরকারি নথিতে মামলার নাম হলো ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’। ১৯৬৬ সালের ৯ই মে ৬ দফা আন্দোলনের কারণে জেলে বন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি বেকসুর খালাস দেয়া হয় আবার ১৮ জানুয়ারি সামরিক আইনে জেলগেট থেকে আবার গ্রেফতার করে ঢকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এ মামলায় ৩৫ জন অভিযুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে অন্য ৩৪ জন অভিযুক্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৫ জনের নাম দেওয়া হল: ১. লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন

২. স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান

৩. ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক

৪. সার্জেন্ট জহুরুল হক

৫. ক্যাপ্টেন শওকত আলী

 

আগরতলা মামলার বিচার কার্য পরিচালনার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৯৬৮ সালের ১৯শে জুন বেলা ১১টায়  মামলার শুনানি শুরু হয়। প্রখ্যাত আইনজীবী আব্দুস সালাম খানের নেতৃত্বে অভিযুক্তদের আইনজীবীদের নিয়ে একটি ডিফেন্স টিম গঠন করা হয়।অনদিকে যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাঙ্গালীরা বৃটেনের প্রখ্যাত আইনজীবী টমাস উইলিয়ামকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী হিসেবে প্রেরণ করে। পাকিস্থান সরকারের পক্ষে প্রধান কৌশলি ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্জুরকাদের ও এডভোকেট জেনারেল টি এচই খান। ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতি ছিলেন এস.এ রহমান। অপর দুই বিচারপতি ছিলেন এম আর খান ও এম হাকিম। বিচারকার্য চলার সময় পূর্বপাকিস্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের মামলা জোরদার হয়। আইয়ুব-মোনায়েম বিরোধী আন্দোলনে জনগণ যখন মুখর, তখন ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ‘ডাকসু’ কার্যালয়ে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া ও মেনন উভয় গ্রুপ) জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের একাংশ (দোলন গ্রুপ) সাংবাদিক সম্মেলন করে স্টুডেন্ট একশান কমিটি (SAC) গঠন করে এবং ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ছাত্রদের ১১ দফা ঘোষিত হলে জনগণ ছাত্রসমাজের ডাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেয় এবং সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ছাত্রদের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েই ৮টি রাজনৈতিক দল মিলে ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি DAC (Democratic Action Committee) গঠন করে। দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পাকিস্থান আওয়ামী লীগ, পাকিস্থান মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামিক পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইত্যাদি। DAC ৮ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। SAC এর ১১ দফা ও DAC এর ৮ দফার ভিত্তিতে আন্দোলন বেগবান হয়। SAC এর ১১ দফার মধ্যে ১ টি দফা ছিল ৬ দফা।

 

২০ জানুয়ারি ছিল ৬৯’র গণআন্দোলনের মাইলস্টোন। ঐদিন পুলিশের গুলিতে অন্যতম ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান নিহত হয়। ২৪ তারিখে নবকুমার ইনষ্টিটিউটের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর এবং খুলনায় তিন জন নিহত হন। ২৪ জানুয়ারিকে বর্তমানে গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহরুল হককে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে পাকিস্থানের সেনারা  বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটের সামনে শান্ত মাথায় কোন কারণ ছাড়াই নৃশংসভাবে বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে। অবশেষে আইয়ুব সরকার পূর্বপাকিস্থানের জনগণের কাছে নতি শিকার করে। আগরতলা মামলার প্রত্যাহার করে নেয়। বঙ্গবন্ধুসহ মামলার সকল অভিযুক্তদেরকে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে মুক্তি দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তি উপলক্ষে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ রেসকোর্স ময়দানে একটি সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সেই বিশাল জনসভায় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের (SAC) পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

 

১৯৭০ সালের নির্বাচন

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করলে তাঁর উত্তরসূরি জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্থানের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে ১৯৭০ সালের ২৬ শে মার্চ এক বেতার ভাষণে পরবর্তী নির্বাচন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সর্বপ্রকার বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে পুনরায় রাজনৈতিক তৎপরতার অনুমোদন দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৫ই অক্টোবর জাতীয় পরিষদ ও ২২শে অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তারিখ ঘোষনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা পিছিয়ে ৭ই ডিসেম্বর এবং ১৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। তবে কিছু এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হওয়ায় ওইসব এলাকাতে ১৯৭১ সালের ১৭ই জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক ছিল নৌকা এবং নির্বাচনী কর্মসূচি ছিল ৬ দফা। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের ১১১নং আসন (ঢাকা-৮) থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং জয়ী হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০ আসন লাভ করে। যে দুটি আসন আওয়ামী লীগ জয়ী হতে হয়নি সেগুলো হল: পার্বত্য রাঙ্গামাটি (চট্টগ্রাম-১০) আসনে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় জয় লাভ করে। এটি ছিল পরিষদের ১৬২ নং আসন। অন্যটি হল ময়মনসিংহ ৮ আসন যাতে জয়লাভ করেন নুরুল ইসলাম। সংরক্ষিত মহিলা আসন সহ আওয়ামী লীগ মোট ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। আবার, পূর্ব পাকিস্থানের প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ২৮৮টি আসন। সংরক্ষিত নারী আসনের ১০টি সহ মোট ৩১০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসন পেয়ে নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সে সময় জাতীয় পরিষদের সদস্যদের এমএনএ এবং

প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের এমপিএ বলা হত। জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় এ দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়া ছিল ন্যায় সঙ্গত। কিন্তু পাকিস্থানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা দিতে গড়িমসি শুরু করে। তিনি ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্ররোচনায় ১লা মার্চ স্থগিত ঘোষণা করে। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্থানের ছাত্র, শ্রমিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা সাধারণ মানুষ বিক্ষোবে ফেটে পড়ে। ১লা মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাহজাহান সিরাজ ডাকসুর সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে আ.স.ম আব্দুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন এ চার নেতা মিলে এক বৈঠকে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন। এ চার ছাত্রনেতাকে বলা হত মুক্তিযুদ্ধের চার খলিফা। এ সংগঠনের উদ্যোগে ২রা মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট আহ্বান করা হয় এবং ঐ দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক ছাত্র সমাবেশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

 

স্বাধীনতার ইশতেহার

একাত্তরের ৩রা মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আহূত পল্টন ময়দানের সমাবেশে ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ পাঠ করা হয়। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন  শাহজাহান সিরাজ। ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চের স্বাধীনতার ইশতেহারে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষনা দেওয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ ঘোষণা করা হয়।

 

অসহযোগ আন্দোলন

বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৩রা মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর তা আর বেগবান হয়। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি সমূহ ছিল:

১. কর প্রদান বন্ধ

২. সকল অফিস আদালত হরতাল পালন করবে

৩. সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে

৪. বেতার টিভি আওয়ামী লীগের সংবাদ প্রচার করবে

৫. পরিবহণ চালু থাকবে

৬. ব্যাংক ২টা পর্যন্ত খোলা থাকবে

৭. প্রত্যেক ভবনে পতাকা উড়বে

৮. ব্যাংকসমূহ পশ্চিম পাকিস্থানে অর্থ প্রেরণ করবে না

 

আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে উঠলে ইয়াহিয়া খান বাধ্য হয়ে ৬ই মার্চ ঘোষণা করেন যে, ‘২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে এবং তার পূর্বে ১০ মার্চ ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য ১২ জন নেতার এক ঘরোয়া বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ঘোষনার মধ্যে ষড়যন্ত্রের আভাস লক্ষ্য করে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন যে, ‘বাঙ্গালীর তাজা রক্ত মাড়িয়ে আমি কোন সম্মেলনে বসতে পারিনা।’

 

৭ মার্সের ঐতিহাসিক ভাষণ

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। রেসকোর্সের বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষনা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তিনি আরও বলে, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দবি, এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্সের বিষয়বস্তু ছিল ৪টি। যথা:

১. চলমান সামরিক আইন প্রত্যাহার

২. সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া

৩. গণহত্যার তদন্ত করা

৪. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা

 

পাকিস্থানী শাসকদের কতিপয় দম্ভোক্তি

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জেনারেল ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, “এদেশের মানুষ চাইনা, মাটি চাই।” মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে টিক্কা খান দম্ভোক্তি করে বলেছিল, “লোকটি এবং তার দল পাকিস্থানের শত্রু, এবার তারা শাস্তি এড়াতে পারবেনা।”