বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৮ সালের ২৭ জুন (বাংলা ১৩ই আষাঢ়, ১২৪৫) পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার অর্ন্তগত কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্রাজুয়েট তিনি।ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি পেশা শুরু করেন। পরবর্তীতে ম্যাজিস্ট্রেট হন।বাংলা গদ্য বিকাশে তার অসামান্য অবদানের জন্য বাংলা সাহিত্যে তিনি অমর হয়ে আছেন।তিনি বাংলা সাহিত্যধারার প্রতিষ্ঠাতা পুরুষের মধ্যে অন্যতম। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা সাহিত্যের জনক বলা হয়। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক।তাঁকে ‘বাংলার স্কট’ বলা হয়। বাংলা সাহিত্যে পাশ্চাত্য আদর্শে তিনিই প্রথম উপন্যাস রচনা করেন।সাহিত্যের রসবোদ্ধদের কাছে তিনি ‘সাহিত্য সম্রাট’ উপাধি লাভ করেন।

১৮৭২ সালে প্রকাশিত বাংলা ভাষার আদি সাহিত্য পত্রিকা ‘বঙ্গদর্শন’ এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।তিনি তাঁর ছদ্মনাম হিসেবে ‘কমলাকান্ত’ বেছে নেন।বঙ্কিমচন্দের পর তাঁর অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের বহুমূত্র রোগ ১৮৯৪ সালের মার্চ মাসে বেশ বেড়ে যায়।অবশেষে ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল (বাংলা ২৬শে চৈত্র, ১৩০০) তিনি মারা যান।

 

সাহিত্য

কাব্যগ্রন্থ

 

ললিতা তথা মানস: ১৮৫৬ সালে রচিত এটি বঙ্কিমের প্রথম কাব্যগ্রন্থ।

উপন্যাস

বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসসমূহ হলো: Rajmohan’s Wife, দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুন্ডলা, কৃষ্ণকান্তের উইল, রজনী, বিষবৃক্ষ, রাজসিংহ, মৃণালিনী, আনন্দমঠ, সীতারাম, দেবী চৌধুরাণী, ইন্দিরা, রাধারাণী, যুগলাঙ্গুরীয়, চন্দ্রশেখর,।

 

Rajmohan’s Wife: এটি বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজী ভাষায় রচনা করেন।লেখকের প্রথম উপন্যাস এটি।

দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫): বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বাংলা উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। উড়িষ্যার অধিকারকে কেন্দ্রকরে মুঘল ও পাঠানদের মধ্যে সংঘর্ষের পটভূমিতে এই উপন্যাস রচিত। প্রধান চরিত্র- আয়েশা, দুর্গেশনন্দিনী  তিলোত্তমা,  জগৎসিংহ, বিমলা । দুর্গেশনন্দিনী’ অর্থ দুর্গ প্রধানের কন্যা।  

কপালকুণ্ডলা (১৮৬৫): বঙ্কিমের ২য় বাংলা উপন্যাস।বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমানন্টিক বা রোমান্সধর্মী উপন্যাস কপালকুণ্ডলা। নায়িকা কপালকুণ্ডলা নায়ক নবকুমারকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ?’ এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক সংলাপ। উপন্যাসটির অন্যান্য উল্লেখ্যযোগ্য সংলাপ

-“প্রদীপ নিবিয়া গেল।”

-“তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইবোনা কেনো।”

এই উপন্যাসের উল্লেখ্যযোগ্য চরিত্র-কপালকুণ্ডলা, নবকুমার, মতিবিবি, কাপালিক।

 

কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮): বঙ্কিমের শ্রেষ্ঠ এবং সমকালে বিতর্কিত উপন্যাস এটি। এটি একটি সামাজিক উপন্যাস। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিধবা রোহিণী স্বীয় ব্যর্থ জীবনের হাহাকারের জন্য আত্মহত্যা করতে ছেয়েছিলেন।প্রধান চরিত্র-রোহিণী, গোবিন্দলাল, ভ্রমর/ভ্রমরা/কৃষ্ণমোহিনী, হরলাল, ব্রহ্মানন্দ

 

রজনী: রজনী একটি সামাজিক উপন্যাস। বাংলা ভাষায় প্রথম মনস্তাত্ত্বিকমূল উপন্যাস। ‘রজনী’ কে প্রকৃতপক্ষে উপন্যাস না বলে রোমান্স বলা হয়ে থাকে। কারণ এখানে বেশ কল্পদৃশ্যে সংগঠিত হয়েছে। চরিত্রসমূহঃ লবঙ্গলতা, অমরনাথ, রজন, শচীন্দ্র। 

বিষবৃক্ষ (১৮৭৩): এটিও একটি সামাজিক উপন্যাস। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় সমস্যার সাথে একাধিক বিবাহ তার রূপতৃষ্ণা ও নৈতিকতার দ্বন্দ, নারীর আত্মসম্মান ও অধিকারবোধ প্রভৃতি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। প্রধান চরিত্র: কুন্দনন্দিনী, নগেন্দ্রনাথ, সূর্যমুখী, হীরা, তারাচরণ,  দেবেন্দ্রনাথ।

 

রাজসিংহ: এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব ও রাজপুত রাজা রাণা রাজসিংহের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল তা এই উপন্যাসের প্রধান বিষয়। চরিত্র – জেবুন্নেসা

 

মৃণালিনী (১৮৬৯): উপন্যাসটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর বাংলাদেশ ও তুর্কি আক্রমণের ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত। মগধের রাজপুত্র হেমচন্দ্রের সাথে মৃণালিনীর প্রণয় এবং দেশরক্ষার জন্য হেমচন্দ্রের সংকল্প ও ব্যর্থতার সঙ্গে এক রহস্যময়ী নারীর মনোরম কাহিনি এ উপন্যাসের মূল বিষয়। চরিত্র – হেমচন্দ্র, মৃণালিনী,  পশুপতি, মনোরমা

 

আনন্দমঠ (১৮৮২): ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পটভূমিকায় সন্নাসীর বিদ্রোহের ছায়া অবলম্বনে রচিত উপন্যাসটিতে লেখকের দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। চরিত্র-  মহেন্দ্র, কল্যাণী, ভবানন্দ, ব্রহ্মচারী

ইন্দিরা: ইন্দিরা ছোট উপন্যাস, অনেকে বলেন বড়ো গল্প। চরিত্র- কুমুদিনী/ইন্দিরা, সুভাসিনী, রমন, উপেন।

 

সীতারাম: বঙ্কিমচন্দ্রের সর্বশেষ উপন্যাস সীতারাম। এটি একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। চরিত্র- সীতারাম, গঙ্গারাম, রমা, নন্দা, জয়ন্তী

 

ইতিহাসাশ্রয়ী ঘটনার সঙ্গে গার্হস্থ্য জীবন কাহিনির মিশ্রণ  ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাস। চরিত্র- চন্দ্রশেখর,  প্রতাপ,  শৈবলিনী।

** যুগলাঙ্গুরীয় ছোট আখ্যান। কেই কেই বলেন ছোট উপন্যাস বা বড় গল্প। চরিত্র- হিরণ্ময়ী, অমলা, ধনদাস, পরন্দর

**ত্রয়ী উপন্যাস: বঙ্কিমের ত্রয়ী উপন্যাস হলো আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণী ও সীতারাম।

‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসে বাংলার সমাজ ও পারিবারিক পটভূমিকায় গার্হস্থ্য কাহিন নির্ভর উপন্যাস। চরিত্র- প্রফুল্ল,  ব্রহ্মঠাকুরাণী, সাগর, ব্রজেশ্বর।

সীতারাম তার শেষ উপন্যাস।

 

প্রবন্ধ

কমলাকান্তের দপ্তর একটি ব্যঙ্গাত্মক রম্য রচনা। বইটি ইংরেজ সাহিত্যিক ও সমালোচক  ডি.কুইসির Confession English Opium Eater অবলম্বনে রচিত। সংকলনটির সর্বশেষ রচনার ‍শিরোনাম ছিল ‘কমলাকান্তের জবাববন্দির’। কমলাকান্তের জবানবন্দি নকশা জাতীয় হালকা সরস রচনা। ১২৮৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন সংখ্যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। কমলাকান্ত নামক আফিমখোর, খ্যাপাটে কিন্তু চিন্তাশীল ও প্রতিভাসম্পন্ন চরিত্রটি বঙ্কিমের অনন্য সৃষ্টি।আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সাক্ষীকে উকিলের জেরার একটা চালচিত্র বা চিত্রধর্মী বর্ণনা ফুটে উঠেছে। হালকা রসালো কথাবার্তার ভিতর দিয়ে তৎকালীন আদালতের বিচারব্যবস্থা অসঙ্গতি দিকটি এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

‘ললিতা তথা মানস’ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ।

সাম্য: গ্রন্থটি বঙ্কিমচন্দ্র বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

লোকরহস্য:  এটি ব্যঙ্গাত্মক।

মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত: এটিও ব্যঙ্গাত্মক।

এছাড়াও তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ গুলো হল-  প্রবন্ধ পুস্তক, ধর্মতত্ত্ব অনুশীলন,  বিজ্ঞানরহস্য, বিবিধ প্রবন্ধ, কৃষ্ণচরিত্র, ধর্মতত্ত্ব।

 

পালামৌ

বাংলা সাহিত্যের প্রথম রচয়িতা বঙ্কিমভ্রাতা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম ‘পালামৌ’ (১৮৮০)। এটি প্রথম ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’।