ব্রিটিশ শাসন

ব্রিটিশ শাসন

 

ভারতীয় উপমহাদেশে ও বাংলাদশে ইউরোপীয়দের আগমন

 পর্তুগিজ নাবিক বার্থোলোমিউ দিয়াজ ১৮৮৭ সালে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ইউরোপ হতে পূর্বদিকে আগমনের জলপথ আবিষ্কার করেন। সেই সূত্র ধরেই ইউরোপ হতে ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কৃত হয় ১৪৯৮ সালে। পর্তুগিজ নাবি ভাস্কো-ডা-গামা এই জলপথ আবিষ্কার করেন। তিনি ইউরোপ থেকে ভারতের কালিকট বন্দরে উপস্থিত হন।

পর্তুগিজদের আগমন

পর্তুগালের লোকদের পর্তুগিজ বলে। উপমহাদেশে ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে পর্তুগিজরা। ১৫১৪ সালে উড়িষ্যার অন্তর্গত পিপলি নামক স্থানে সর্বপ্রথম কুঠি স্থাপন করে। ভারতে পর্তুগিজ উপনিবেশগুলোর প্রথম গভর্ণর ছিলেন আলবুর্কাক। তিনি কোচিনে একটি দূর্গ নির্মাণ করেন। এই দুর্গটি ভারতের প্রথম ইউরোপীয় দূর্গ। বাংলায় ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে প্রথম এসেছিল পর্তুগিজরা ১৫১৬ সালে।১৫৩৭ সালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে কুঠি নির্মাণ করেন। শেরশাহকে প্রতিরোধের জন্য সুলতান মাহমুদ শাহ পর্তুগিজদের সাহায্যপ্রার্থী হয়। মাহমুদ শাহের পক্ষে পর্তুগিজরা শেরশাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে। যুদ্ধে জয়ী হয়ে শেরশাহ ক্ষমতা লাভের পর পর্তুগিজদের এই দেশ থেকে বিতাড়িত করে। সম্রাট শাহজাহান ১৬৩২ সালে হুগলী থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে। ১৬৬৬ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে সুবেদার শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম দখল করে পর্তুগিজদের চট্টগ্রাম হতে বিতাড়িত করে। পর্তুগিজরা বাংলাদেশে ফিরিঙ্গি নামে পরিচিত। পর্তুগিজ জলদস্যুদের বলা হত ‘হার্মাদ’।

ওলন্দাজদের আগমন

হল্যান্ডের (নেদারল্যান্ডের) অধিবাসীদের ডাচ বা ওলন্দাজ বলা হয়। তারা পর্তুগিজদের দেখাদেখিতে এদেশে আসে এবং ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠন করে। প্রথমে পর্তুগিজ এবং পরে ইংরেজরা ছিল তাদের প্রতিদ্বন্দী। ইংরেজদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে তারা এ দেশ ছেড়ে চলে যায় এবয় ইন্দোনেশিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন করে।

দিনেমারদের আগমন

ডেনমার্কের লোকদের বলা হয় ডেনিশ বা দিনেমার। তারা এদেশে বাণিজ্য করার জন্য ‘ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠন করে। কিন্তু বাণিজ্যে তেমন সুবিধা করতে না পেরে ইংরেজদের কাছে কুঠি বিক্রয় করে চলে যায়।

 ইংরেজদের আগমন

ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেদ এবং দিল্লীর সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে প্রাচ্যের সাথে বাণিজ্য করার জন্য ২১৮ জন ইংরেজ বণিকদের চেষ্টায় ১৬০০ সালে ‘ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠিত হয়। ক্যাপ্টেন হকিন্স ১৬০৮ সালে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের সুপারিশপত্র নিয়ে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের উদ্দেশ্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন। ক্যাপ্টেন হকিন্সের আবেদনক্রমে সম্রাট জাহাঙ্গীর সুরাটে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণের অনুমতি দেন।সেই বছর অর্থাৎ ১৬০৮ সালে ইংরেজরা উপমহাদেশে প্রথম কুঠি স্থাপন করে সুরাটে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। ১৬৩৩ সালে হরিহরপুরে তারা এই কুঠি নির্মাণ করেন। দীর্ঘকাল পরে১৬৫১ সালে হুগলী শহরে তারা দ্বিতীয় কুঠি নির্মাণ করেন। ঐ বছর বাংলার সুবেদার শাহজাদা সুজা ইংরেজদের এদেশে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি দেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৬৯০ সালে কোম্পানির এজেন্ট জন চার্নক সুতানটি গ্রামে একটি নগর প্রতিষ্ঠা করেন। পরে কলকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম কিনে নগরটিকে আরো বড় করা হয়। এভাবেই গড়ে উঠে বিখ্যাত কলকাতা শহর। ১৬৯৮ সালে কলকাতায় ইংল্যান্ডর রাজা উইলিয়ামের নামানুসারে ‘ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ’ নির্মিত হয়। মুঘল সম্রাট ফখরুখশিয়ার ১৭১৭ সালে এক ফরমান জারি করেন। এতে মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময় সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকর প্রদান করেন।

ফরাসিদের আগমন

ইউরোপীয় জাতিগুলোর মধ্যে উপমহাদেশে সবার শেষে ব্যবসা করতে আসে ফরাসিরা। তারা প্রায় ১০০ বছর এদেশে বাণিজ্য করে। তারা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠে কিন্তু ১৭৬০ সালে বন্দীবাসের যুদ্ধে ইংরেজদের সাথে হেরে ভারত ছেড়ে চলে যায়।

 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে উপমহাদেশ

 

এলাহাবাদ চুক্তি

বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের পর ক্লাইভ ইচ্ছে করলে দিল্লীর অধিকার আদায় করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে দিল্লীর সম্রাট শাহ আলমের সাথে ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদে একটি চুক্তি করেন। এই চুক্তির ফলে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ মুঘল বাদশা দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করেন।

দ্বৈত শাসন

দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তক লর্ড ক্লাইভ। এই শাসন ব্যবস্থায় তিনি নবাবের হাতে নেজামত ক্ষমতা অর্থাৎ বিচার ও শাসনের দায়িত্ব অর্পণ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপর রাজস্ব ও দেশরক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। ফলে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং জনগণের দুর্দশা চরমে পৌছে। ১৭৬৫-৭০ সালে বাৎসরিত রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ যা ছিল, দুর্ভিক্ষের বছরও আদায়ের পরিমাণ তার কাছাকাছি ছিল।ফলে চরম শোষণ নির্যাতনে বাংলার মানুষ হতদরিদ্র ও অসহায় হয়ে পড়ে। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় নবাবের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় প্রশাসন পরিচালনায় তিনি সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন। সারাদেশে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। এই পরিস্থিতিতে ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হিস্টিংস দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটান।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

রবার্ট ক্লাইভের দ্বৈতশাসন নীতি এবং ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচার, উৎপীড়ন ও শোষণের ফলে বাংলার জনসাধারণের অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হয়ে পড়ে। এছাড়া ১৭৭০ সালে অনাবৃষ্টি ও খরার কারণে ফসল নষ্ট হয়ে গেলে বাংলায় প্রচন্ড খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। সমগ্র দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। এ দুর্ভিক্ষে প্রায় এক কোটি লোক মারা যায়। বাংলায় ১১৭৬ সালের (ইংরেজি ১৭৭০) এ দুর্ভিক্ষ ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ এর সময় বাংলার গভর্নর ছিলেন কার্টিয়ার।

নিয়ামক আইন, ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ

দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় ইংরেজ কোম্পানি অবহেলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের কাহিনী বৃটিশ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে সুদূর ইংল্যান্ডে দ্বৈতশাসনের বিরুদ্ধে তুমুল বির্তক শুরু হয়। এজন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সুপারিশক্রমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে নিয়ামক আইন পাস হয়। এই আইনের ফলে কোম্পানির গভর্নর এর পদ গভর্নর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়।

ভারত শাসন আইন, ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ

 ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট ভারত শাসনের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করেন। যা ভারত শাসন আইন নামে পরিচিত। ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত পিটের ভারত শাসন আইন কার্যকর ছিল।

 

গভর্নরের শাসন (১৭৭৩-১৮৩৩)

 

ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭৩-১৭৮৫)

উপমহাদেশের প্রথম ‘রাজস্ব বোর্ড’ স্থাপন করেন ওয়ারেন হেস্টিংস। রাজকোষের শূণ্যতা পূরণের উদ্দেশ্যে ওয়ারেন হেস্টিংস ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা পাঁচ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার নিয়ম প্রবর্তন করেন। এটি পাঁচশালা বন্দোবস্তু নামে পরিচিত ছিল। তিনি ক্লইভ লয়েডের দ্বৈত শাসন রহিত করেন ১৭৭৩ সালে এবং একই বছর হতে পাঁচশালা বন্দোবস্তু চালু করেন।

লর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৮৬ -১৭৯৩)

লর্ড কর্নওয়ালিস সরকারী কর্মচারীদের জন্য যে বিধি চালু করেন পরবর্তীতে তা ‘ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস’ নামে প্রচলিত হয়। ১৭৮৯ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় দশসালা বন্দোবস্তু চালু করেন। ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দশসালা বন্দোবস্তুকে ‘চিরস্থয়ী বন্দোবস্ত ‘ বলে ঘোষনা করা হয়।জমিদারগণ নিয়মিত খাজনা পরিশোধ না করায় কোম্পনি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ফলে ‘সূর্যাস্থ আইন’ পাস করে নির্দিষ্ট সময়ে খাজনা পরিশোধ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে খাজনা পরিশোধ করতে না পারায় অনেক জমিদার জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়।

লর্ড ওয়েলসলি (১৭৯৮-১৮০৫)

লর্ড ওয়েলসলি অধীনতা মিত্রতা নীতি প্রয়োগ করে তাঞ্জোর, সুরাট, কর্ণাটক এবং অযোধ্যার স্বাধীনতা হরণ করেন। টিপু সুলতান ছিলেন মহীশূরের শাসনকর্তা। তিনি দ্বিতীয় মহীশূর যুদ্ধে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারন করে ব্রিটিশ সেনাপতি ব্রেইথওয়েডকে পরাজিত করে বিপুল সম্মান ও খ্যাতি অর্জন করেন। লর্ড ওয়েলসলি টিপু সুলতানকে অধীনতামূল মিত্রতা নীতিগ্রহণের আমন্ত্রণ জানা। টিপু সুলতান এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলে ওয়েলসলি টিপুর বিরুদ্ধে এ ১৭৯৯ সাণে চতুর্থ মহীশূর যুদ্ধ ঘোষনা করেন। এই যুদ্ধে টিপুর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেন লর্ড ওয়েলসলি এর ভ্রাতা আর্থার ওয়েলসলি। টিপু বীরের ন্যায় যুদ্ধ করে নিহত হন।

 

গভর্নর জেনারেলদের শাসন (১৮৩৩-১৮৫৭)

 

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক (১৮২৮-১৮৩৫)

লর্ড বেন্টিক রাজ্য বিস্তার অপেক্ষা সমাজ সংস্কার কাজের জন্য সমৃদ্ধি লাভ করেন। লর্ড বেন্টিক ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর আইন করে সতীদাহ প্রথা রহিত করেন। এই ব্যাপারে তিনি রাজা রামমোহন রায়ের সক্রিয় সহযোগিতা লাভ করেন। ভারতবর্ষে প্রাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে সর্বপ্রথম আইন প্রণয়ন করেন।

লর্ড ডালহৌসি (১৮৪৮-১৮৫৬)

উপমহাদেশে ইংরেজ শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন লর্ড ডালহৌসি। তিনি স্বত্ব বিলোপ নীতির প্রয়োগ করে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটান। লর্ড ডালহৌসি ‘স্বত্ব বিলোপ নীতি’ ব্যাপক প্রয়োগ করলেও তিনি এর উদ্ভাবক ছিলেন না। এই নীতি পূবেই প্রণীত হয়েছিল। তিনি এই নীতি প্রয়োগ করে সাঁতারা, ঝাঁসি, নাগপুর, সম্বলপুর প্রভৃতি রাজ্যগুলো বৃটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।

১৮৫৩ সালে ডালহৌসি উপমহাদেশে সর্বপ্রথম রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করেন। তিনি ডাকটিকিটের মাধ্যমেভারতের বিভিন্ন স্থানে চিটিপত্র আদান প্রদানের ব্যবস্থা করেন। তিনি টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করেন। লর্ড ডালহৌসি ১৮৫৬ সালে ২৬ জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাস করে হিন্দু বিধবাদের পুনঃবিবাহ প্রথা চালু করেন। বিধবা বিবাহ প্রচলনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেন।

 

ভাইসরয়ের শাসন (১৮৫৮-১৯৪৭)

 

লর্ড ক্যানিং (১৮৫৬-১৮৬২)

সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনভার ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়ার হাতে অর্পন করেন। ইংল্যান্ডের মহারানীর প্রতিনিধি হিসাবে গভর্নর জেনারেলকে ভাইসরয় বা বড়লাট উপাধি দেওয়া হয়। ভারত শাসনের জন্য মহারানীর পক্ষ থেকে লর্ড ক্যানিং প্রথম ভাইসরয় বা রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত হন। এর ফলে ভারতে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন এর অবসান হয়। উপমহাদেশে প্রথম কাগজের মুদ্রা চালু করেন লর্ড ক্যানিং।

 

লর্ড মেয়ো (১৮৬৯-৭২)

ভারতবর্ষে প্রথম আদমশুমারি হয় ১৮৭২ সালে লর্ড মেয়োর শাসনামলে।

 

লর্ড লিটন (১৮৭৬-১৮৮০)

তিনি একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক ছিলেন।তিনি ১৮৭৮ সালে অস্ত্র আইন পাস করে বিনা লাইসেন্সে অস্ত্র রাখা নিষিদ্ধ করেন। একই বছর তিনি সংবাদপত্র আইন পাস করে দেশীয় ভাষায় প্রচারিত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেন।

লর্ড রিপন (১৮৮০-১৮৮৪)

লর্ড রিপন সংবাদপত্র আইন রহিত করে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে। ১৮৮২ সালে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সংস্কারের জন্য হান্টার কমিশন গঠন করেন। লর্ড রিপন ‘ইলবাট বিল’ প্রণয়ন করে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয় অপরাধীদের বিচার করার ক্ষমতা প্রদান করেন। কিন্তু ইলবাট বিলের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেন।  তিনি বেঙ্গল মিনিসিপাল আইনের মাধ্যমে ভারতে প্রথম স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। লর্ড রিপন শ্রমিক কল্যাণের জন্য ‘ফ্যাক্টরি আইন’ পাস করে শিল্প শ্রমিকদের দিনে ৮ ঘন্টা কাজ করার নিয়ম চালু করা করেন।

লর্ড কার্জন (১৮৯৯-১৯০৫)

বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে বাংলা প্রদেশ গঠিত ছিল। ১৯০৫ সালে ১৬ অক্টোবর ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড কার্জন। তিনি এক ঘোষণায় বাংলা প্রদেশকে দুইভাগে ভাগ করেন। এ ঘটনা বঙ্গভঙ্গ বো বঙ্গবিভাগ নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গ অনুযায়ী বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ এবং আসাম নিয়ে গঠিত হয় ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ। এ নবগঠিত প্রদেশের রাজধানী ঢাকা। অপরদিকে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়েগঠিত হয় পশ্চিম বাংলা প্রদেশ যার রাজধানী ছিল কলকাতা। পূর্ববঙ্গ ও আসামের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর ছিলেন ব্যামফিল্ড ফুলার। লর্ড কার্জন কলকাতায় ভারতের বৃহত্তম গ্রন্থাগার ইম্পোরিয়াল লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন।

লর্ড মিন্টু (১৯০৫-১৯১০)

লর্ড মিন্টুর মর্লি-মিন্টু সংস্কার আইন  (১৯০৯) এর মাধ্যমে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হয়।

 

লর্ড হার্ডিঞ্জ (১৯১০-১৯১৬)

‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট হওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী বর্ণহিন্দু সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শে ‘রাখিবন্ধন’ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বাঙালি ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গানটির রচনা করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিবাদের মুখে ১৯১১ সালে দিল্লীর দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের সুপারিশ করেন ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। ১৯১২ সালে  বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ব ও পশ্চিম বাংলাকে একত্রিত করে কলকাতাকে রাজধানী করে ‘বেঙ্গল প্রদেশ’ সৃষ্টি করা হয়। ১৯১২ সালে বৃটিশ ভারতীয় রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে হস্তান্তর করা হয়।

 

লর্ড চেমসফোর্ড (১৯১৬-১৯২১)

মন্টেগু- চেমসফোর্ড সংস্কার আইন (১৯১৯) ভারত শাসন আইন নামেও পরিচিত। এই আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রে দুইকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ছিল কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল বড়লাটের হাতে। প্রাদেশিক দ্বৈতশাসন নীতি কার্যকর ছিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ছিল গভর্নরের হাতে। ফলে জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবি অপূর্ণই থেকে যায়।

লর্ড মাউন্টব্যাটেন (১৯৪৭)

ব্রিটিশ-ভারতের শেষ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। ভারত বিভাগের সময় ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এটলি। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ পাস হয়। এই আইন অনুসারে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচিতে পাকিস্থান গণপরিষদের হাতে এবং ১৫ আগস্ট ভারতীয় গণপরিষদের হাতে মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। স্যার সাইরিল রেডক্লিফের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন নামে পরিচিত। অবিভক্ত বাংলার শেষ  গভর্নর ছিলেন স্যার ফ্রেডরিক জন বারোজ।

 

ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন

ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা লাভের পর সর্বপ্রথম যে বিদ্রোহ হয়েছিল তা ইতিহাসে ‘ফকির বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। ফকিররা ১৭৬০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেছিলেন। ফকিরদের সাথে সন্ন্যাসীরাও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিম ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসীদের সমর্থন কামনা করেন। ফকির-সন্ন্যাসীগণ মীর কাশিমের পক্ষে যুদ্ধও করেন। বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিম পরাজিত হলেও ফকির-সন্ন্যাসীগণ তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। ফকির আন্দোলনের নেতা মজনু শাহ ও ভবানী পাঠক। মজনু শাহের নেতৃত্বে ফকিরগণ রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকায় ইংরেজ বিরোধী তৎপরতা শুরু করেন। মজনু শাহের মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে ফকির আন্দোলন স্থিমিত হয়ে পড়ে।

 

চাকমা বিদ্রোহ

১৭৬০ সালে চট্টগ্রাম জেলা ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে আসে। ১৭৬১ সাল থেকে নতুন কোম্পানি সরকার বার বার রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে থাকে। ১৭৭২-৭৩ সাল থেকে চাকমা রাজা জোয়ান বকসকে মুদ্রায় রাজস্ব দিতে বাধ্য করা হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে মুদ্রা অর্থনীতি প্রচলনের ব্যবস্থা করা হয়। এতে পার্বত্য জীবনে অস্থিরতা দেখা দেয়। ১৭৭৭ সালে রাজস্বের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করা হলে প্রধান নায়েব রুনু খান রাজা জোয়ান বকসের সম্মতিক্রমে কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। রুনু খানকে দমন করতে কোম্পানি বার বার সৈন্য প্রেরণ করে কিন্তু বার বার কোম্পানিকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। এভাবে প্রায় দশ বছর যুদ্ধ চলে। অবশেষে কোম্পানি ক্লান্ত হয়ে ১৭৮৭ সালে চাকমা রাজার সাথে সন্ধি স্থাপন করে।

 

তিতুমীরের আন্দোলন বা বারাসাত বিদ্রোহ

তিতুমীর ১৭৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসত মহকুমার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিতুমীরের প্রকৃত নাম মীর নেছার আলী। তিতুমীর প্রথম বারাসতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।তিনি চব্বিশ পরগনার কিছু অংশ, নদীয়া ও ফরিদপুরের কিছু অংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন।তাঁকে দমন করতে প্রেরিত ইংরেজ বাহিনী তিতুমীরের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এ বিদ্রোহ বারাসতের বিদ্রোহ নামে পরিচিত।বারাসতের বিদ্রোহের পর তিতুমীর ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনিবার্য বুঝতে নারিকেলবাড়িয়ায় ১৮৩১ সালে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। কোম্পানি সরকার ১৮৩১ সালে ইংরেজ লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। ১৯ নভেম্বর ভীষণ যুদ্ধ হয়। ইংরেজ কামান ও গোলাগুলিতে বাঁশের কেল্লা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। তিতুমীর ও তার চল্লিশজন সহচন শহীদ হন। তিতুমীর প্রথম বাঙ্গালী হিসাবে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে শহীদ হন।

ফরায়েজী আন্দোলন

বাংলায় ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুসলমান সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে চরম দুর্দশা নেমে আসে। মুসলিম সমাজে এ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতন দেখে যিনি সংস্কারের জন্য এগিয়ে আসেন তিনি হলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৭৮১ সালে মাদারীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামে ফরজ পালনের জন্য তিনি জোর প্রচেষ্টা চালান। এ ফরজ থেকেই আন্দোলনের নাম ফরায়েজী হয়েছে। ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল ফরিদপুর জেলা। হাজী শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র মহসিনউদ্দীন ওরফে দুদু মিয়া। দুদু মিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোল নিতে থাকে। ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি কৃষকদের জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করা ছিল এ  আন্দোলনের লক্ষ্য। ‘জমি থেকে খাজনা আদায় আল্লাহর আইনের পরিপন্থী’ – খাজনা আদায়ের জন্য জমিদারদের অত্যাচার রোধকল্পে দুদু মিয়া আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এ উক্তি করেন।

 

১৮৫৮ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা মহাঅভ্যুত্থান

১৮৫৬ সালে ‘এনফিল্ড’ নামক এক প্রকার বন্দুকের ব্যবহার শুরু করেন। এ বন্দুকের কার্তুজ দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে ব্যবহার করতে হত। গুজব রটে যে, কার্তুজ শুয়োর ও গরুর চর্বি দিয়ে তৈরি। হিন্দু ও মুসলমান সিপাহীদের মনে বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল যে, তাদের ধর্ম বিনষ্ট করে দেওয়ার জন্য ইংরেজ সরকার এ কার্তুজ প্রচলন করে। এ কারণে সিপাহি বিদ্রোহ হয় এবং দেশময় ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৫৭ সালের ২৬ জানুয়ারি ব্যারাকপুরের সিপাহিরা প্রথম বিদ্রোহ করে।ক্রমে তা বহরমপুর ও মীরাটে ছড়িয়ে পড়ে।লক্ষ্ণৌ, ঝাঁসি, বেরেলি, অযোধ্যা, রোহিলাখন্দ, কানপুর ইত্যাদি ব্রিটিশ বিরোধী কেন্দ্রে পরিণত হয়। সিপাহীরা দিল্লি অধিকার করে মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করে। ১৮৫৭ সালের বিপ্লবকে কেউ কেউ ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ আবার কেউ কেউ একে ‘জাতীয় সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করে। এটি ছিল পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত এ সংগ্রাম ব্যর্থ হয়। চার মাস অবরোধের পর ব্রিটিশগণ দিল্লি দখল করে নেয়। মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে আরাকানে নির্বাসন দেওয়া হয়।

 

নীল বিদ্রোহ

অষ্টাদশ শত্ব্দীর শেষের দিকে ইউরোপে শ্লিবিপ্লবের ফলে বস্ত্রশিল্পের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয় এবং কাপড়ের রং করার জন্য নীলের চাহিদা বেড়ে যায়। এ ব্যবসা ছিল অত্যন্ত লাভজনক। ফলে ইংরেজরা এদেশে নীলচাষ শুরু করে। কিন্তু নীলকররা এদেশের চাষিদের বিভিন্নভাবে ঠকাত। এতে প্রতিবাদ করলে বা নীল চাষে সম্মত না হলে চাষি ও তার পরিবারের উপর চলত অমানুষিক অত্যাচার। নীল চাষিরা তাই প্রথমে সংঘবদ্ধভাবে নীল চাষে অসম্মতি জানায়। ১৮৫৯-১৮৬০ এ ফরিদপুর, যশোর, পাবনা, রাজশাহী, মালদহ, নদীয়া, বারাসত প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। নীল বিদ্রোহ দমন করার জন্য ইংরেজ সরকার ‘নীল কমিশন’ গঠন করে। কমিশন সরজমিনে নীলচাষিদের অভিযোগের সত্যতা পায়। ফলে সরকার একটি আইন দ্বারা ঘোষণা করেন যে, নীলকররা বলপূর্বক চাষিদের নীলচাষে বাধ্য করতে পারবেনা এবং সেটা করলে আইনত দণ্ডনীয় হবে। এ আইন পাসের ফলে ১৮৬০ সালে নীল বিদ্রোহের অবসান হয়।

 

ওয়াহাবী আন্দোলন

আঠারো শতকের শেষের দিকে মুসলিম দেশগুলোতে রাজনৈতিক জীবনের অবক্ষয়ের সাথে সাথে শুরু হয় ধর্মীয় ও সামাজিক অধঃপতন। আরবদেশের নেজদের অধিবাসী মুহম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব এক সংস্কার আন্দোলনের প্রবর্তন করেন। এ আন্দোলন তাঁর নামানুসারে ওহাবী আন্দোলন নামে পরিচিত। কুসংস্কার ও অনৈসলামিক রীতিনীতি দূর করে পবিত্র কুরআন হাদীস নির্দেশিত সরল পথে মুসলিম সমাজকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা তাঁর সংস্কার আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল।

 

তেভাগা আন্দোলন

তেভাগা আন্দোলন ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাস হতে শুরু হয়ে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চলে। মোট উৎপন্ন ফসলের তিনভাগের দুইভাগ পাবে চাষী, একভাগ পাবে জমির মালিক -এই দাবি থেকে তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। বাংলার প্রায় ১৯টি জেলায় তেভাগা আন্দোলন নামে কৃষক আন্দোলন শুরু হয়। তবে দিনাজপুর ও রংপুর জেলায় এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এ আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন ইলা মিত্র।

 

আলীগড় আন্দোলন

অসহযোগ, খেলাফত ও ফরায়েজী আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই প্রগতিমূলক ভাবধারা গড়ে তোলার গড়ে তোলার জন্য যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তা আলীগড় আন্দোলন নামে পরিচিত। আলীগড় আন্দোলনের প্রবর্তক ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা

১৮৮৫ সালে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ বা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজ সিভিলিয়ন এলান অক্টোভিয়ান হিউম। ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

 

মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা

১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম লীগের প্রকৃত নাম ছিল ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ।’ মুসলিম লীগ গঠনের প্রধান উদ্যোক্ত ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ, আগা খান এবং নওয়াব ভিকার-উল-মূলুক।

 

স্বদেশী আন্দোলন

বঙ্গবঙ্গের প্রতিবাদে যে আন্দোলন গড়ে উঠে তাকে সাধারণভাবে স্বদেশী আন্দোলন বলে। কবি মুকুন্দ দাস বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে ‘পড়ো না রেশমী চুড়ি বঙ্গনারী’ গান গেয়ে জনগণের মধ্যে স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে তীব্র আবেগ তৈরি তোলে। শেষ পর্যায়ে স্বদেশী আন্দোলন রূপ নেয় বৈপ্লবিক সশস্ত্র আন্দোলনে।

বাংলায় সশস্ত্র বৈপ্লবী আন্দোলন

১৯০৬ সাল থেকে পরিচালিত এ বৈপ্লবিক আন্দোলনকে ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রসবাদী আন্দোলন হিসাবে চিহ্নিত করে। ঢাকার ‘অনুশীলন সমিতি’ এবং কলকাতার ‘যুগান্তর পার্টি’ ছিল বৈপ্লবিক আন্দোলনের দুই শক্তিশালী সংগঠন। ঢাকায় ‘অনুশীলন সমিতি’র নেতা ছিলেন পুলিন বিহারী দাশ এবং ‘যুগান্তর পার্টি’র নেতা ছিলেন বাঘা যতীন (প্রকৃত নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়)।

বিপ্লবীরা ১৯০৮ সালে বাংলার গভর্নর এন্ড্রু ফ্রেজার এবং পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর বিপ্লবীদের লক্ষ্য ছিল প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংস ফোর্ড। ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকি বিহারে মোজাফফরপুরে কিংস ফোর্ডের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করেন। কিন্তু কিংস ফোর্ড গাড়িতে ছিলেন না, ছিলেন অন্য এক ইংরেজের স্ত্রী ও কন্যা। এ হামলায় তারা উভয়ই নিহত হন। ক্ষুদিরাম ধরা পড়েন এবং তাঁর ফাঁসি হয়। প্রফুল্ল চাকি আত্মহত্যা করেন।

বঙ্গবঙ্গ রদের পরেও বিপ্লবী আন্দোলন চলতে থাকে। বাংলার সশস্ত্র আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠনের ঘটনা। এই দুঃসাহসিক অভ্যুত্থানের নেতা ছিলেন স্থানীয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষক সূর্যসেন যিনি মাস্টারদা নামে পরিচিত। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি তাঁর দলবল নিয়ে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন করেন। অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পর উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে পাহাড়তলীর রেলওয়ে ক্লাব আক্রমণ।ব্রিটিশ সরকার সূর্যসেনসহ অধিকাংশ নেতাকে ধরতে সমর্থ হয়। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামে সূর্যসেনের ফাঁসি হয়।

* ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম শহীদ ক্ষুদিরাম

* ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম মহিলা শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

লক্ষ্ণৌ চুক্তি

১৯১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একই সাথে লক্ষ্ণৌ শহরে নিজ নজি দলীয় সম্মেলন আহ্বান করে। এ সম্মেলনে উভয় দলের নেতারা ঐতিহাসিক ‘লক্ষ্ণৌ চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তি মূলত হিন্দু ও মুসলমানদের সম্প্রীতি ও সমঝোতার এক মূল্যবান দলিল।

রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড

ভারতের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ও বঙ্গবঙ্গরদ আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯১৮ সালে কুখ্যাত ও প্রতিক্রিয়াশীল রাওলাট আইন প্রবর্তন করে। এই আইনের দ্বারা সংবাদপত্রের কন্ঠরোধ এবং যেকোন লোককে নির্বাসন এবং বিনা বিচারে কারাদণ্ড ও নির্বাসন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।পাঞ্জাবে কুখ্যাত রাওলাট আইনের প্রতিবাদে জনগণের শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা ও প্রতিবাদ চলাকালে সরকার গুলি চালিয়ে কিছু লোককে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে ১৯১৮ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ান ওয়ালাবাগ  উদ্যানে ১০ হাজার মানুষ সমবেত হন। জেনারেল ডায়ার সমবেত জনগণকে কোনরূপ হুশিয়ারি প্রদান না করে তার সেনাবাহিনীকে গুলি বর্ষনের নির্দেশ দেন।

এত বহুলোক হতাহত হয়। জালিয়ান ওয়ালাবাগ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কাহিনী প্রচারিত হলে সমস্ত ভারতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ সরকারের দেয় নাইট উপাধি বর্জন করেন রবিঠাকুর।

খিলাফত আন্দোলন

ভারতীয় মুসলমানগণ তুরস্কের সুলতানকে খলিফা বলে মান্য করত এবং মুসলিম জাহানের ঐক্যের প্রতীক মনে করত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক ব্রিটিশ বিরোধী শিবিরে যোগ দেয়। এতে ভারতের মুসলমানরা পড়ে মহাফাঁপড়ে। একদিকে তারা ছিল ব্রিটিশদের অনুগত প্রজা অপরদিকে তুরস্কের সুলতান ছিল তাদের খলিফা। ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের আশ্বাস দেয় তুরস্কের প্রতি কোন অবিচার করা হবেনা। সরল বিশ্বাসে মুসলমানগণ ব্রিটিশ সরকারকে সমর্থন দেয়। যুদ্ধে মিত্রপক্ষ জয়ের ফলে ব্রিটিশরা তুরস্কের ক্ষতি সাধন করে। তুরস্ককে ভেঙ্গে চুরমার করে মুসলমানদের মনে প্রবল আঘাত হানে। তুর্কী সাম্রাজ্যের অখন্ডতা এবং খিলাপতের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ১৯১৯ সালে মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, ড. আনসারী, আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খান প্রমুখ যে আন্দোলন শুরু করেন তা খিলাফত আন্দোলন নামে পরিচিত।

অসহযোগ আন্দোলন

অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের জনক মহাত্মা গান্ধী। রাউলাট ও জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ১৯২০ সালের ১০ মার্চ গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। এর অর্থ হল ভারতীয়গণ ব্রিটিশ সরকারের সাথে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকবে, অফিস আদালতে কাজ করবে না, ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া উপাধি বর্জন করবে ইত্যাদি।

অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন

১৯২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে অসহযোগ এবং খিলাফত আন্দোলন যুগপৎভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশের চৌচিরনামক একটি গ্রামে পুলিশ ও বিক্ষোবকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। জনতা থানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। ২২ জন পুলিশ পুড়ে মারা যায়। আন্দোলন অহিংস থাকছেনা বলে গান্ধিজী আন্দোলন স্থগিত ঘোষনা করে। অসহযোগ আন্দোলন সমাপ্তির পর খিলাফত আন্দোলনও দূর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় মোস্তফা কামাল তুরস্কের ক্ষমতায় আসে এবং খিলাফতের অবসান হয়। ফলে আন্দোলনেরও সমাপ্তি হয়।

স্বরাজদল ও বেঙ্গল প্যাক্ট

চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে কংগ্রেসের একাংশ ১৯২৩ সালে স্বরাজ পার্টি গঠন করে। ১৯২৩ সালের নির্বাচনে স্বরাজ দল কেন্দ্রীয় আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বরাজদল বাংলার আইন পরিষদে দ্বৈতশাসনব্যবস্থা অচল করার জন্য নির্বাচিত মুসলমান সদস্যদের সমর্থন লাভের চেষ্টা করেন।

চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে বঙ্গীয় কংগ্রেস কমিটি বাংলার মুসলমানদের সাথে ১৯২৩ সালে একটি সমঝোতায় পৌছান। এ সমঝোতা বেঙ্গল প্যাক্ট বা বাংলা চুক্তি নামে পরিচিত। এটি ছিল বাংলায় হিন্দু-মুসলমানদের মিলনের জন্য একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

সাইমন কমিশন

১৯২৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ভারতে আরও রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক অধিকার দেওয়ার সম্ভাবনা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে ৮ সদস্যের একটি বিধিবদ্ধ পার্লামেন্টারি কমিশন গঠন করে। স্যার জন সাইমনকে এ কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। এ কমিশনে কোন ভারতীয় প্রতিনিধি ছিল না। ১৯৩০ সালে এই কমিশন রিপোর্ট প্রকাশ করে।

নেহেরু রিপোর্ট

সাইমন কমিশন গঠনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ কংগ্রেস ভারতবাসীর জন্য উপযোগী শাসন সংস্কারের চেষ্টা চালায়। এ পর্যায়ে মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ১৯২৮ সালের আগস্ট মাসে একটি রিপোর্ট পেশ করে। এ রিপোর্ট নেহেরু রিপোর্ট নামে পরিচিত।

জিন্নাহর চৌদ্দদফা

নেহেরু রিপোর্টের প্রতিবাদে ১৯২৯ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার জন্য ১৪ দফা দাবি উত্থাপন করেন যা জিন্নাহর চৌদ্দদফা নামে পরিচিত।

আইন অমান্য আন্দোলন

গান্ধী ভারতে ‘পূর্ণ স্বরাজ্য’ প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৩০ সালে আইন অমান্য ও সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। ব্রিটিশ সরকার মারাত্মক নিপীড়নের মাধ্যমে আইন অমান্য আন্দোলন বন্ধ করার চেষ্টা করেন। ১৯৩২ সালে গান্ধী সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলন বন্ধ করে দেন।

 

গোল টেবিল বৈঠক

প্রথম দফা: ভারতের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে সাইমন কমিশনের সুপারিশ সম্পর্কে আলোচনার জন্য সরকার ১৯৩০ সালে লন্ডনে ‘গোল টেবিল’ বৈঠক ডাকেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক প্রমুখ নেতৃবৃন্দ এ বৈঠকে যোগদান করেন। জিন্নাহ এই বৈঠকে চৌদ্দদফা পেশ করেন। কংগ্রেস এ বৈঠকে যোগদান হতে বিরত থাকে।

দ্বিতীয় দফা: ১৯৩১ সালে গান্ধী-আরউইন চুক্তির পর দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন।কিন্তু গান্ধী ও মুসলমানদের মধ্যে আপোষ না হওয়ায় দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকও ব্যর্থ হয়।

ভারত শাসন আইন

সাইমন কমিশন ও গোলটেবিল বৈঠকের আলোকে ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তন করা হয়। এই আইনের বৈশিষ্ট্য ছিল ভারত শাসনে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার পদ্ধতি এবং প্রদেশগুলোর প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন প্রবর্তন।

 

১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ও হক মন্ত্রিসভা

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভার ৬০টি আসন কংগ্রেস, ৫৯টি আসন মুসলিম লীগ এবং ৫৫টি আসন কৃষক প্রজা পার্টি লাভ করে। কোন দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। সংবিধান অনুযায়ী গভর্নর বঙ্গীয় আইনসভার কংগ্রেস সংসদীয় দলের নেতা শরৎ বসুকে মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানান। শরৎবসু ‘কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা’ গঠনে অনীহা প্রকাশ করলে কৃষক প্রজা পার্টি নেতা শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক আবারো কংগ্রেসের সাথে ‘কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু কংগ্রেসের সংকীর্ণ, অনুদার ও অদূরদর্শী নেতাদের অনীহার কারণে শেরে বাংলার এ উদ্যোগ সফল হয়নি। কংগ্রেসের নেতাগণ শেরে বাংলার জাতীয়তাবাদ ও উদার মানসিকতাকে পছন্দ করলেও তাঁর জমিদারি প্রথা অবসানের দাবিকে মেনে নিতে পারেননি। কেননা মুসলিম লীগের মত কংগ্রেসও জমিদারি প্রথা বিলুপ্তকরণের বিরাধী ছিলেন। এরই সুযোগ গ্রহণ করে মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগ শেরে বাংলার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব দেয়। শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক ও কৃষক প্রজা পার্টি এ প্রস্তাব গ্রহণ করে। শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের এই কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার ১১জন মন্ত্রীসভার সদস্যের ৬ জন ছিল মুসলিম এবং ৫ জন ছিল হিন্দু। ফজলুল হক মন্ত্রিসভা বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের জন্য ১৯৩৮ সালে ‘ক্লাউড কমিশন’ গঠন করে একই সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধন করে জমিদারদের ক্ষমতা হ্রাস এবং কৃষক প্রজাদের অধিকার সম্প্রসারণের চেষ্টা করে। ১৯৩৮ সালে ‘বঙ্গীয় চাষী খাতক আইন’ পাস করা হয়। এর ফলে ঋণগ্রস্থ কৃষকগণ ঋণভার লাঘবের সুযোগ পায়। এ আইনের আলোকে অবিভক্ত বাংলার সর্বত্র ‘ঋণ সালিসি বোর্ড’ গঠিত হয়। ১৯৩৯ সালে ‘বঙ্গীয় চাকরি নিয়োগ বিধি’ প্রণীত হয়। এতে মুসলমানদের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ চাকরি নির্দিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করা হয়।নবাব সিরাজউদ্দৌলা কর্তৃক ইংরেজ বন্দী নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে ‘হলওয়েল মনুমেন্ট’ নির্মাণ করেছিল ফজলুল হক মন্ত্রিসভা তা অপসারণ করে দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসা লাভ করতে সক্ষম হয়।

ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা ছিল দুর্বল। মুসলিম লীগ এই সময় শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের উপর নানাবিধ চাপ প্রয়োগ করে। মুসলিম লীগের চাপের মুখে তিনি সামসুদ্দিন আহমদকে বাদ দিয়ে জমিদার মোশাররফ হোসেন কে মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করলে তাঁর নিজ দলেই ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। তিনি তাঁর দলের বিক্ষুব্ধ ১৭ জন সদস্যকে বহিষ্কার করেন। ফলে প্রাদেশিক আইনসভায় মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ট দলে পরিণত হয় এবং কৃষক প্রজা পার্টি সংখ্যালগিষ্ট দলে পরিণত হয়। মন্ত্রিসভার স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যই শেরে বাংলা মুসলীম লীগের সাথে ১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে যোগদান করতে বাধ্য হন। ১৯৪১ সালে মন্ত্রিসভা থেকে মুসলীম লীগ সদস্যদের পদত্যাগ করার ফলে তাঁকেও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে হয়।

এ.কে. ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা

১৯৪১ সালে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে মতানৈক্যের ফলে এ কে ফজলুল হক মুসলীম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ড. শ্যামপ্রসাদের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন।এ মন্ত্রিসভা শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা নামে পরিচিত। এই মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কে ফজলুল হক। ১৯৪৩ সালে মন্ত্রিসভার পতন হয়।

দ্বি জাতি তত্ত্ব

১৯৩৭ সালে ভারতের স্বায়ত্তশাসন কার্যকর হলেও মুসলমানরা উপেক্ষিত হতে থাকে। এমন অবস্থায় ১৯৪০ সালের ২২ মার্চ লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে জিন্নাহ মুসলমান ও হিন্দুদের জাতিসত্ত্বা সর্ম্পকে যে তাত্ত্বিক ভাবধারা বিশ্লেষন তাই দ্বিজাতি তত্ত্ব নামে পরিচিত। এ ভাষণে জিন্নাহ বলেন, “যে কোন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মুসলমানরা একটা জাতি। তাই তাদের একটি পৃথক আবাসভূমি প্রয়োজন, প্রয়োজন একটা ভূখণ্ডের এবং একটি রাষ্ট্রের।” জিন্নাহ তার  দ্বি-জাতি তত্ত্বের পক্ষে নিম্নোক্ত যুক্তি পেশ করেন-

১. ভারত একটি দেশ নয় বরং একটি উপমহাদেশ।

২. যে ভিত্তিতে এ উপমহাদেশে হিন্দুরা একটি জাতি, সে ভিত্তিতে মুসলমানরাও একটি জাতি।

৩. মুসলমানদের ভাষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, নৈতিক বিধান, আচার-ব্যবহার, ইতিহাস, ঐতিহ্য হিন্দুদের থেকে ভিন্ন।

৪. হিন্দু-মুসলিম জনগণ অনুপ্রেরণা লাভ করে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে। অতএব আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞায় আমরা একটি জাতি।

লাহোর প্রস্তাব

১৯৩৯ সালে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন যে, হিন্দ মুসলমান দুইটি আলাদা জাতি। তার এ ঘোষণা ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ হিসাবে পরিচিত। ১৯৪০ সালের ২২ মার্চ লাহোরে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক ঐতিহাসিক ‘লাহোর প্রস্তাব’ উত্থাপন করেন। লাহোর প্রস্তাবের মূলকথা ছিল উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে নিয়ে  একাধিক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।অন্য কোন ব্যবস্থা মুসলমানদের নিকট গ্রহণযোগ্য হবেনা। উপমহাদেশে লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্থানের কোনো উল্লেখ ছিল না। তবুও এ প্রস্তাব পাকিস্থান প্রস্তাব নামেও পরিচিত। একাধিক রাষ্ট্রের পরিবর্তে একটি মাত্র রাষ্ট্রগঠনের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ প্রস্তাবের ভিত্তিতেই পাকিস্থান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। প্রস্তাবের ধারাগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল:

১. ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী সংলগ্ন ও সন্নিহিত স্থানসমূহকে ‘অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিতকরণ।

২. ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বভাগের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন।

৩.  এমন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনবোধে ভারতবর্ষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট এলাকাগুলোর সীমানা পরিবর্তন।

৪. এসব স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রদেশ বা অঙ্গরাষ্ট্রগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।

৫. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর সাথে পরামর্শ করে তাদের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত, কার্যকর ও বাধ্যতামূলক বিধান করা।

ক্রিপস মিশন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান মিত্র পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করলে জাপানি আক্রমণের বিরুদ্ধে এ দেশীয় সাহায্য সহযোগিতা লাভ করার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল স্যার স্ট্যামফোর্ড ক্রিপসকে ১৯৪২ সালে এ উপমহাদেশে প্রেরণ করেন। তিনি রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে যে কয়টি প্রস্তাব করেন, তা ‘ক্রিপস প্রস্তাব’ নামে খ্যাত।

ভারত ছাড় আন্দোলন

ভারতের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হলে ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ‘ভারত ছাড়’ দাবিতে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়।

 

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ/পঞ্চাশের মন্বন্তর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) দখল করলে এখান থেকে বাংলায় চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে বাংলার খাদ্য শস্য ক্রয় করে বাংলার বাহিরে সৈন্যদের রসদ হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অসাধু, লোভী ও মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা খাদ্য গুদামজাত করে। এছাড়া অনাবৃষ্টির ফলে বাংলার খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পায়। ফলে ১৯৪৩ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সালব্যাপী দুর্ভিক্ষে এবং এর ফলে সৃষ্ট মহামারিতে প্রায় ৩৫-৩৮ লক্ষ লোক মারা যায়। বাংলায় ১৩৫০ সালে সংঘঠিত এই দুর্ভিক্ষে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত।

মন্ত্রী মিশন

১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি তাঁর মন্ত্রিসভার তিন সদস্যকে ভারতে প্রেরণ করেন যা মন্ত্রী মিশন বা ক্যাবিনেট মিশন নামে পরিচিত।

১৯৪৬ সালের নির্বাচন ও সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভা

১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আবুল হাসেম এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ জয়লাভ করেন। ১৯৪৬ সালের ২৪ এপ্রিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। এটি ছিল অবিভক্ত বাংলার শেষ মন্ত্রিসভা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শেষ মূখ্যমন্ত্রী।