ভারতচন্দ্র রায়

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

 

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের জীবনকাল হলো ১৭১২ থেকে ১৭৬০। ভারতচন্দ্র বর্ধমানের (বর্তমান হাওড়া জেলা) পেঁড়োবসন্তপুর বা পান্ডুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতার নাম নরেন্দ্রনারায়ণ রায়, মাতা ভবানী দেবী।

 

তিনি আঠার শতকের মঙ্গলকাব্য ধারার শ্রেষ্ঠকবি।তিনি বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি, ফারসি ও আরবি জানতেন।ভারতচন্দ্র ছিলেন নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি।রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘অন্নদামঙ্গল’ (১৭৫২-৫৩) রচনার জন্য তাকে রায়গুণাকর উপাধি দেন। ভারতচন্দ্রকে বলা হয় নাগরিক কবি। তিনি ছিলে মধ্যযুগের শেষ বড় কবি।তাঁর আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে ‘সত্য পীরের পাঁচালি’।

‘আমার সন্তান যেন থাকে’ ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে ঈশ্বরী পাটনীর চরিত্রের মুখ দিয়ে এটি বলিয়েছেন।

 

ভারতচন্দ্রের কয়েকটি কথা প্রবাদে পরিনত হয়েছে। সেগুলো হল

“মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন”

“নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়”

 

 

ভারতচন্দ্রের জীবন বেশ রোমাঞ্চকর।তার জন্মের পর তাঁর পরিবারের জীবনে নেমে আসে দুর্দিন।১৭১৩ সালে বর্ধমানের রাজা ভুরসুট আক্রমন করে এবং ভবানিপুরের গড় দখল করেন। তখনকার ভুরসুট পরগণায় ছিলো পান্ডুয়া গ্রাম।এ গ্রাম চলে যায় বর্ধমান রাজার দখলে।এর ফলে তার পরিবার হারিয়ে ফেলে তাদের সকল জমিজমা ও ধনসম্পত্তি।

তার বয়স যখন দশ বছরের মত তখন তিনি তার মামার বাড়ি পালিয়ে যান।মামার বাড়ির ছিলো নওয়াপাড়া।সেখানে বসবাসের সময় তিনি সংস্কৃত ভাষা শিখেন।তিনি বিয়ে করেন মাত্র ১৪ বছর বয়সে। কিন্তু পড়াশেষ করে বাড়ি ফিরে অভিনন্দনের বদলে তিনি তিরস্কার পান। তখনকার সময় রাজ ভাষা ছিলো ফারসি, তাই সমাজে ফারসির মর্যাদা ছিল অনেক। কিন্তু তিনি ফারসি না শিখে শিখেন সংস্কৃত ভাষা।তাই তার পরিবারের সদস্যরা সারাক্ষন তাকে এটা নিয়ে জ্বালাতন করতো।এজন্য তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে মনস্থির করেন ফারসি ভাষা শিখবেন।আবার পালিয়ে তিনি হুগলি জেলার দেবানন্দপুরের রামচন্দ্র মুনশির বাড়িতে রাজভাষা ফারসি শিখেন উৎসাহ নিয়ে। তাঁর শিক্ষক এতে মোহিত হন।রামচন্দ্র মুনশির বাড়িতেই তিনি সর্বপ্রথম কবিতা রচনা করেন।

ফারসি ভাষা শিখে তিনি ১৭২৮ সালে বাড়ি ফেরেন।সম্পত্তির দেখাশোনার ভার পড়ে তাঁর ওপর, একাজে তিনি বর্ধমান যান। কিন্তু এক অঘটনের কারনে বর্ধমানের রাজা তাকে গ্রেফতার করে। কিন্তু কিছুদিন পর কারাগার হতে তিনি পালান।তিনি বর্ধমান রাজার সীমার বাইরে চলে যান ওড়িষ্যাতে। সেখোনে সন্নাসী হয়ে ঘুরে বেড়ান। তবে সন্ন্যাসী হয়ে বৃন্দাবনে যাওয়ার সময় হুগলী জেলার কৃষ্ণনগর গ্রামে কিছু আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়ে যায়। ফলে তাকে সন্ন্যাসী বেশ ছেড়ে বাড়ি ফিরতে হয়।

 

ফিরে তিনি চাকুরী খুজতে থাকেন।ফরাশডাঙ্গায় তখন ফরাশি সরকারের বড় কর্মচারী ছিলেন ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।ভারতচন্দ্র গিয়ে তাকে ধরলেন। ইন্দ্রনারায়ণ ভারতচন্দ্রের কবি প্রতিভা দেখে তাকে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে পাঠান।রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে সভাকবি করেন। কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে উপাধি দেন ‘রায়গুণাকর’।ভারতচন্দ্রের বেতন ছিল মাসিক চল্লিশ টাকা।এছাড়াও তাকে অনেক জমিজমা দেন।

ভারতচন্দ্র অনেক হাস্যরসিক ছিলেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্যাসুন্দর’ রচনা করে রাজাকে শোনানোর উদ্দ্যেশে রওয়ানা দেন। কিন্তু রাজা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় কাব্যটির পাতা না উল্টিয়ে পাশে রেখে দেন। ভারতচন্দ্র তখন বলে উঠেন, ‘মহারাজ করছেন কী, সব রস যে গড়িয়ে পড়বে!’ রাজা তখন অন্য কাজ রেখে চোখের সামনে খুলে ধরেন “বিদ্যাসুন্দর” কাব্য, যে কাব্য বাংলা ভাষায় নানা কারণে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

অন্নদামঙ্গলকাব্য তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগের নাম  ‘অন্নদামঙ্গল’, দ্বিতীয় ভাগের নাম “বিদ্যাসুন্দর”, এবং শেষ ভাগের নাম “ভবানন্দ-মানসিংহ কাহিনী”। ভারতচন্দ্র এ কাব্যে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ভবানন্দের গুণকীতন করেন।