মধ্যযুগের ইতিহাস

মধ্যযুগ (১২০১-১৮০০)

 

মধ্যযুগের শ্রেনিবিভাগ

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ১২০১ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। ১২০৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম মুসলমান শাসনের সূত্রপাত এবং ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের বিজয়ে তার অবসান হয়। তাই বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের সবটুকুই মুসলিম শাসনামলের অন্তর্গত।

 

মধ্যযুগকে তিনটি শ্রেনীতে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা:

১. তুর্কি যুগ (১২০১-১৩৫০)

২. সুলতানি যুগ (১৩৫১-১৫৭৫)

৩. মোগল শাসন (১৫৭৬-১৭৫৭)

 

তুর্কি যুগ (১২০১-১৩৫০)

বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের শুরুতেই ১২০১ থেকে ১৩৫০ সাল পর্যন্ত  সময়কে তথাকথিত ‘অন্ধকার যুগ’ বলে একটি বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। তুর্কি শাসকদের সময়কে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয়।

তুর্কি যুগকে প্রধানত ভাষা গঠনের যুগ ছিল বলে মনে করা হয়। অন্ধকার যুগে কোন সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি একথাও সত্য নয়।এ সময়ে বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক নিদর্শন পাওয়া না গেলেও অন্যান্য ভাষায় সাহিত্য  সৃষ্টির নিদর্শন বর্তমান থাকাতে অন্ধকার যুগের অপবাদের অসারতা প্রমানিত হয়। অন্য ভাষায় রচিত গ্রন্থ-

 

শূণ্যপুরাণ: রামাই পণ্ডিত রচিত ধর্মপূজার শাস্ত্রগ্রন্থ। ‘শূণ্যপুরাণ’ গদ্য-পদ্য মিশ্যিত চম্পূকাব্য ‘নিরঞ্জনের রুষ্মা’ শূন্যপুরাণ কাব্যের অংশ বিশেষ।

 

সেক শুভোদয়া: রাজা লক্ষণ সেনের সভাপতি হলায়ূধ মিশ্র রচিত ‘সেক শুভোদয়া’ সংস্কৃত গদ্যপদ্যে লেখা চম্পূকাব্য।

 

সুলতানি যুগ

পাঠান সুলতানগণ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে পৃষ্ঠপোষকতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই সময়ে গৌড়ীয় শাহী দরবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সাংস্কৃতিক কেন্দ্ররূপে গড়ে উঠেছে। গৌড়কে কেন্দ্র করে এই সময়ে বাংলা সাহিত্যের বিকাশের গুরুত্ববিবেচনা করে ড. দীনেশচন্দ্র সেন এই আমলকে ‘গৌড়ীয় যুগ’ও বলে অভিহিত করেন। এসময়ে রুকনউদ্দীন বরবক শাহ এর পৃষ্ঠপোষকতায় জৈনুদ্দীন ‘রসুলবিজয়’ কাব্য এবং আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় বিপ্রদাস পিপিলাই ‘মনসাবিজয়’ কাব্য রচনা করেন।

 

মোগল যুগ

 

আরাকান রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান কবিগণ প্রণয়কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র্য ধারার প্রবর্তন করেন।

 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এটি সর্বজন স্বীকৃত ও খাঁটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম কাব্য। কাব্য পুথিঁটির রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস (ছদ্মনাম-অনন্ত বড়ু)। বড়ু চণ্ডীদাস মধ্যযুগের আদি বা প্রথম কবি।কাব্যটি বাংলা ভাষায় রচিত কোনো লেখকের প্রথম একক গ্রন্থ। কবি চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ দিকে কাব্যটি রচনা করেন। পুঁথিতে প্রাপ্ত একটি চিরকুট অনুসারে এই কাব্যের প্রকৃত নাম ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ’। ১৯০৯ সালে ‘বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ’ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রামের এক গৃহস্থ বাড়ির গোয়ালঘর থেকে পুঁথিটি উদ্ধার করেন। ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে  বসন্তরঞ্জন রায়ের সম্পাদনায় কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।

‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যেরপ্রধান চরিত্র রাধা (জীবাত্মা বা প্রাণিকূল), কৃষ্ণ (পরমাত্মা বা ঈশ্বর) ও বড়াই (প্রেমের দূতী)।কাব্যটি মোট ১৩ খন্ডের।‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ পাঁচালী করে না গেয়ে নাটগীত হিসেবে নৃত্য ও অভিনয়ের মাধ্যমে গাওয়া যেত।পুঁথিটিকে তাই ‘ঝুমুর’ জাতীয় লৌকিক নাটগীতের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করা যায়।

 

মৌলিক সাহিত্য

 

পদ বা পদাবলি

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনা ‘বৈষ্ণব পদাবলি’। বৌদ্ধ বা বৈষ্ণবীয় ধর্মের গূঢ় বিষয়ের বিশেষ সৃষ্টি পদ বা পদাবলি। পদাবলি সাহিত্য বৈষ্ণবতত্ত্বের রসভাস্য।বৈষ্ণব গীতিতে পাঁচটি রসের উল্লেখ পাওয়া যায়। যথাঃ -শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য এবং মধুর। বৈষ্ণবদের উপাস্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর আনন্দময় তথা প্রেমময় প্রকাশ ঘটেছে রাধার মাধ্যমে।‘বৈষ্ণব পদাবলি’ রাধা ও কৃষ্ণের আর্কষণ-বিকর্ষণের বিচিত্র অনুভূতি সম্বলিত এক প্রকার গান। তাই রাধাকৃষ্ণ প্রেম-লীলার মাধুর্য পদাবলির গানের উপজীব্য হয়েছিল।শ্রীকৃষ্ণ ও তার ভক্তদের যে মধুর সম্বন্ধ এবং এই প্রিয় সম্বন্ধজনিত পরস্পরের মধ্যে যে সম্ভোগ ভাব তার নাম মধুর রস। বৈষ্ণব সমাজে বৈষ্ণব পদাবলি ‘মহাজন পদাবলি’ এবং বৈষ্ণব পদকর্তাগণ ‘মহাজন’ নামে পরিচিত ছিল। পদাবলির আদি কবি বিদ্যাপতি। তিনি ব্রজবুলি ভাষায় পদগুলো রচনা করেন।বাংলা ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলির আদি রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস।জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, লোচনদাস, বলরামদাসের নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।আধুনিকযুগের কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

ব্রজবুলি ভাষা

ব্রজবুলি ভাণা মূলত মৈথিলি ও বাংলা মিশ্রণে এক মধুর সাহিত্যিক ভাষা। বৈষ্ণব পদাবলির অধিকাংশই রচিত হয়েছে ‘ব্রজবুলি’ নামক একটি কৃত্রিম মিশ্র ভাষায়। এতে কিছু হিন্দি শব্দও আছে। ব্রজলীলা সম্পর্কিত পদাবলির ভাষা -‘ব্রজবুলি’ নামে পরিচিত। ‘ব্রজবুলি’ কখনও মানুষের মুখের ভাষা ছিলোনা। সাহিত্যকর্ম ব্যতিত অন্যত্র এর কোন ব্যবহার নেই।

 

মঙ্গলকাব্য

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে বিশেষ এক শ্রেণির ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্য হলো ‘মঙ্গলকাব্য’। ‘মঙ্গল’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘কল্যাণ’। মঙ্গলকাব্য রচনার মূল কারণ স্বপ্নদেবী কর্তৃক আদেশ লাভ। সে কাব্য দেবতার আরাধনা, মাহাত্ম্য-কীর্তন করা হয়; যে কাব্য শ্রবণেও মঙ্গল হয় এবং বিপরীতটিতে অমঙ্গল।

যে কাব্য মঙ্গলাধার, এমন কি, যে কাব্য ঘরে রাখলেও মঙ্গল হয় তাকে বলা হয় মঙ্গলকাব্য। বাংলা সাহিত্যের নানা শ্রেণির কাব্যে মঙ্গল কথাটির প্রয়োগ থাকলেও কেবল বাংলা লৌকিক দেবতাদের নিয়ে রচিত কাব্যই মঙ্গলকাব্য

 নামে অভিহিত হয়। মঙ্গলকাব্যে প্রধানত মনসা ও চণ্ডী এই দুই দেবতার প্রাধান্য বেশি। উল্লেখযোগ্য মঙ্গলকাব্য হলো- মনসামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও অন্নদামঙ্গল প্রভৃতি।

 

‘চৈতন্যমঙ্গল’, ‘গোবিন্দমঙ্গল’ প্রভৃতি কাব্যের সাথে মঙ্গল নাম থাকলেও এদের সাথে মঙ্গলকাব্যের কোন সর্ম্পক নেই। এগুলো বৈষ্ণব সাহিত্যের অংশ। বিহারীলাল চক্রবর্তীর রচিত ‘সারদামঙ্গল’ মঙ্গলকাব্য নয়, এটি একটি আধুনিক যুগের কাব্য।

 

মঙ্গলকাব্যগুলোকে শ্রেণিগত দিক থেকে দ’ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে-

 

ক) পৌরণিক শ্রেণীঃ গৌরীমঙ্গল, ভবানীমঙ্গল, দুর্গামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, কমলামঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল, চণ্ডিকামঙ্গল প্রভৃতি।

 

খ) লৌকিক শ্রেণীঃ শিবায়ন বা শিবমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, শীতলামঙ্গল, রায়মঙ্গল, কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর, ষষ্ঠীমঙ্গল, সারদামঙ্গল, সূর্যমঙ্গল প্রভৃতি।

 

মনসামঙ্গল

সাপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসা। তাঁর অপর নাম তেকা ও পদ্মাবতী। লৌকিক ভয়ভীতি থেকে এ দেবীর উদ্ভব। এই দেবীর কাহিনী নিয়ে  রচিত কাব্য ‘মনসামঙ্গল’ নামে পরিচিত। কোথাও তা ‘পদ্মাপুরাণ’ নামেও পরিচিত। এ কাব্যের প্রধান চরিত্র চাঁদ সওদাগর, বেহুলা এবং লক্ষীন্দর। পূজা দিতে অস্বীকার করায় বণিক চাঁদ সওদাগরকে মনসা দেবী ধনহারা ও তার পুত্র লক্ষীন্দরকে সর্পদংশনে হত্যা করে পুত্র হারা করে। বেহুলা লক্ষীন্দরের নব পরিণীতা। কানা হরিদত্ত মনসামঙ্গল তথা মঙ্গলকাব্যেরে আদিকবি। এছাড়াও অন্যান্য কবির মধ্যে নারায়ন বে, বিজয় গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস, কেতনদাস, ক্ষেমানন্দের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

চণ্ডীমঙ্গল

চণ্ডী দেবীর কাহিনী অবলম্বনে রচিত চণ্ডীমঙ্গল কাব্য এ দেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেনছে। মাণিক দত্ত চণ্ডীমঙ্গলের আদিকবি। চণ্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি ‘কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী’। ভাড়ুদত্ত, ফুল্লুরা, ধনপতি সদাগর প্রভৃতি চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের প্রধান চরিত্র। ধনপতি সদাগর ছিলেন উজানীনগরের অধিবাসী।

 

ধর্মমঙ্গল

‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যের আদিকবি ময়ূরভট্ট। অন্যান্য কবিদের মধ্যে রয়েছে – রূপরাম চক্রবর্তী, খেলারাম চক্রবর্তী, শ্যাম পণ্ডিত, সীতারাম দাস, রাজারাম দাস এবং সহদেব চক্রবর্তী নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ধর্মঠাকুরের মাতাত্ম্য প্রচারের জন্য ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্য ধারার সূত্রপাত হয়েছে। ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুটি কাহিনী হলো – রাজা হরিশ্চন্দের কাহিনী এবং লাউসেনের কাহিনী।

 

অন্নদামঙ্গল

চণ্ডী ও অন্নদা অভিন্ন একই দেবীর দুইনাম। এ দেবীর কাহিনীই অন্নদামঙ্গলে স্থান পেয়েছে। অন্নদামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। কবি  ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (প্রথম নাগরিক কবি) অষ্টাদশ শতকের তথা মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ভারতচন্দ্র প্রাচীন ভুরসূর পরগনার পেঁড়ো অথবা আধুনিক হাওড়া জেলার পাণ্ডুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কৃষ্ণনগর রাজসভার কবি ছিলেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দের আদেশে তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যটি রচনা করেন। রাজা তাকে ‘রায়গুণাকর’ উপাধিতে ভূষিত করেন।‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যটি তিন খন্ডে রচিত। যথা – শিবনারায়ণ, কালিকামঙ্গল এবং মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান।

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরে অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সত্য পীরের পাঁচালী’।

‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের অমর উক্তি –

১. “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”-ঈশ্বরীপাটনীর এ প্রার্থনা করেছেন।

 

২. “বড়র পিরীতি বালির বাঁধ! ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণেকে চাঁদ।”

 

৩. মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন।

 

৪. নগর পড়িলে দেবালয় কি এড়ায়।

 

জীবনী সাহিত্য

শ্রী চৈতন্য দেব একজন ধর্মপ্রচারক হলেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রভাব ছিল অপরিসীম। এই মহাপুরুষ বাংলায় একটি পঙক্তি না লিখলেও তাঁর নামে একটি যুগের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে চৈতন্য জীবনীগ্রন্থ ‘কচড়া’ নামে পরিচিত।

‘কচড়া’ শব্দের শাব্দিক অর্থ ডায়রি বা দিনলিপি।

 

 

মধ্যযুগ

 

১. প্রাক চৈতন্য যুগ (১৩৫১-১৫০০)

২. চৈতন্য যুগ (১৫০১-১৬০০)

৩. চৈতন্য পরবর্তী যুগ (১৬০১-১৮০০)

 

কচড়া রচয়িতা তথ্য কণিকা
চৈতন্যভাগবত বৃন্দাবন দাস বাংলা ভাষায় শ্রীচৈতন্যের প্রথম জীবনীকাব্য
চৈতন্যমঙ্গল লোচন দাস  
চৈতন্যচরিতামৃত কৃষ্ণদাস কবিরাজ বাংলা ভাষায় সর্বাপেক্ষা তথ্যবহুল শ্রীচৈতন্য জীবনী

 

 

নাথসাহিত্য

প্রাচীন কাল থেকে এ দেশে শিব উপানক এক শ্রেণীর যোগী সম্প্রদায় ছিল, তাদের ধর্মের নাম নাথধর্ম। নাথধর্মের কাহিনী অবলম্বনে রচিত আখ্যায়িকা কাব্য ‘নাথসাহিত্য’ নামে পরিচিত। শেখ ফয়জুল্লাহ এ ধারার আদিকবি। তাঁর নাথধর্মবিষয়ক আখ্যানকাব্য ‘গোরক্ষবিজয়’।

 

মর্সিয়া সাহিত্য

মর্সিয়া’ এক ধরনের শোককাব্য বা শোকগীতি বা বিলাপসঙ্গীত। ‘মর্সিয়া’ কথাটি আরবি, এর অর্থ শোক প্রকাশ করা। মধ্যযুগে বাংলাসাহিত্যে ‘মর্সিয়া সাহিত্য’ নামে এক ধরনের শোককাব্য বিস্তৃত জুড়ে আছে। আরবি সাহিত্যে মর্সিয়ার উদ্ভব নানা ধরনের শোকাবহ ঘটনা থেকে হলেও পরে তা কারবালার প্রান্তরে নিহত ইমাম হোসেন ও অন্যান্য শহীদকে উপজীব্য করে লেখা কবিতা ‘মর্সিয়া’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। মর্সিয়া ধারা উল্লেখ্যযোগ্য কবি নিম্নরূপ:

 

শেখ ফয়জুল্লাহ   : এ ধারায় প্রথম কবি। বিখ্যাত কাব্য ‘জয়নবের চৌতিশা’।

 

দৌলত উজির বাহরাম খান  :  আনুমানিক ১৬ শতকে চট্টগ্রাম জেলার ফতেয়াবাদ (মতান্তরে জাফরাবাদ) এ জন্মগ্রহণ করেন। বিখ্যাত কাব্য ‘জঙ্গনামা’। কারবালার বিষাদময় যুদ্ধবিগ্রহ এ কাব্যের বিষয়বস্তু।

 

সেবরাজ   : বিখ্যাত কাব্য ‘কাশিমের লড়াই’।

 

লোক সাহিত্য

‘লোকসাহিত্য’ বলতে জনসাধারণের মুখে মুখে প্রচলিত গাঁথাকাহিনী, গান, লোকগীতি, রূপকথা, উপকথা, ছড়া, ধাঁধাঁ, প্রবাদ ইত্যাদিকে বুঝানো হয়। সাধারণত কোনো সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর অলিখিত সাহিত্যই লোকসাহিত্য। ‘ডাক ও খনার বচন’ কে লোকসাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘লোকসাহিত্য’ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

 

ছড়া

লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন।

 

ধাঁধাঁ

ধাঁধাঁর বক্তব্য সাধারণত সঙ্গতিপূর্ণ থাকেনা। যেমন- ‘বন থেকে বেরুল টিয়ে সোনার টোপর মাথায় দিয়ে’। এর উত্তর হবে – আনারস।

 

লোকগীতি

লোকসমাজের মুখে মুখে যে গীত চলে এসেছে। এতে কোন কাহিনী থাকেনা। বিশেষ বিশেষ ভাব অবলম্বনে এই শ্রেণির গান রচিত। প্রাচীন বিখ্যাত লোকগীতি সংকলন ‘হারামণি’। মুহম্মদ মুনসুরইদ্দীন ছিলেন এর প্রধান সম্পাদক।

 

গীতিকা

গীতিকা এক শ্রেণির আখ্যানমূলক লোকগীতি; যা সাহিত্যে গীতিকা নামে পরিচিত। ইংরেজিতে একে বলা হয় Ballad। Ballad শব্দটি ফরাসি Ballet বা নৃত্য শব্দ থেকে এসেছে।ইউরোপে প্রাচীনকালে নাচের সাথে যে কবিতা গীত হত তাকেই Ballad বা গীতিকা বলা হত। বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত লোকগীতিগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-

 

১. নাথ গীতিকা: ১৮৭৮ সালে ভাষাবিজ্ঞানী স্যার জর্জ গ্রিয়ার্সন রংপুর জেলার মুসলমান কৃষকদের কাছ থেকে ‘ময়নামতী গোপীচন্দ্রের গান’ পুঁথি সংগ্রহ করে ‘মাণিকচন্দ্র রাজার গান’ নামে প্রকাশ করে। ১৯২২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘গোপীচন্দ্রের গান’ প্রথম খন্ড এবং ১৯২৪ সালে দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়। প্রথম খন্ডের গাথা লোকসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত; দ্বিতীয় খন্ডের আখ্যান দু’জন কবির রচনা। এদের একজন ভবানীদাস ও অন্যজন শুকুর মুহম্মদ। ড. নলিনীকান্ত ঢাকা থেকে ভবানীদাসের ‘ময়নামতীর গান’ এবং শুকুর মুহম্মদের ‘গোপীচাঁদের সন্ন্যাস’ সম্পাদনা করেন।মধ্যযুগের কবি শুকুর মুহম্মদ রাজশাহী জেলার সিন্দুঁর কুসুম গ্রামের অধিবাসী। তার বিখ্যাত কাব্য ‘গোপীচাঁদের সন্ন্যাস’।

 

মৈমনসিংহ গীতিকা: বৃহত্তর ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বাংশে নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর, বিল, নদ-নদী প্লাবিত ভাটি অঞ্চলের গীতিকা। ড. দীনেশচন্দ্র সেন গীতিকাগুলো সংগ্রহ করে ‘মৈমনসিংহ গীতিক ‘ নামে প্রকাশ করেন। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ বিশ্বের ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য গীতিকাগুলো হলো:   

 

 

মহুয়া

মৈমনসিংহ গীতিকার শ্রেষ্ঠ পালা। দ্বিজ কানাই প্রণীত একটি প্রণয় আখ্যান। প্রধান চরিত্র- মহুয়া, নদের চাঁদ।
দেওয়ানা মদিনা মনসুর বয়াতির প্রণীত।
জয়চন্দ্র চন্দ্রবর্তী নয়ানচাঁদ ঘোষ
কাজল রেখা  

 

পূর্ববঙ্গ গীতিকা

পূর্ববাংলার লোকসাহিত্যের একটি সংকলন। মুখে মুখে রচিত ও লোক সমাজে প্রচলিত এর পালাগুলি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফরিদপুর, সিলেট, ত্রিপুরা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে পালাগুলি সংগৃহীত। এ পালাগুলির প্রধান প্রধান সংগ্রাহক হলেন চন্দ্রকুমার দে, দীনেশচন্দ্র সেন, আশুতোষ চৌধুরী, জসীমউদ্দিন, নগেন্দ্রচন্দ্র, রজনীকান্ত ভদ্র, বিহারীলাল প্রমুখ।  ড. দীনেশচন্দ্র সেন গীতিকাগুলো সংগ্রহ করে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ নামে প্রকাশম করেন। উল্লেখযোগ্য গীতিকার মধ্যে রয়েছে – নিজাম ডাকাতের পালা, কাফন চোরা, কমল সদাগর প্রভৃতি।

 

প্রবাদ

প্রবাদ লোকসাহিত্যের একটি অন্যতম অংশ। প্রাচীন কালে মানুষের মুখে মুখে এসব প্রবাদ ছিল। যেমন- ‘যদি বন্ধু থাকে বন্ধুর মত গাঙ পারাইতে কতক্ষণ।’

 

অবক্ষয় যুগ (১৭৬০-১৮৬০)

মধ্যযুগের পরিধি ১২০১ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বিবেটনা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে ১৭৬০ সালে এই যুগের সর্বশেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের তিরোধানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা কাব্যের ইতিহাসে মধ্যযুগের অবসান হয়েছে। ১৭৬০ সালে সালে ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর থেকেই ১৮৬০ সালে আধুনিকতার যথার্থ বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত  এই ‘একশ’ বছর বাংলা কাব্যের ক্ষেত্রে উৎকর্ষপূর্ণ কোনো নিদর্শন বিদ্যমান নেই। সৈয়দ আলী আহসান ১৭৬০-১৮৬০ সাল সময়কে ‘প্রায় শূণ্যতার যুগ’ বলে উল্লেখ করেছেন। মধ্যযুগের শেষ আর আধুনিক যুগের সময়টুকুকে ‘অবক্ষয় যুগ’ বলা হয়। আবার কারও কারও মতে, এই সময়টুকুকে ‘যুগ সন্ধিক্ষণ’ নামে আখ্যায়িত হওয়া উচিত। এ সময়ের একমাত্র প্রতিনিধি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জন্ম চব্বিশ পরগণা জেলার কাঁচড়াপাড়া গ্রামে। তার হাত ধরেই বাংলা কবিতা মধ্যযুগের গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিকতার রূপ পেয়েছে।বাংলা সাহিত্যের দুই যুগের মিলনকারী হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। এজন্যই তাকে ‘যুগসন্ধিক্ষণের কবি’ বলা হয়। তার বিখ্যাত উক্তি-

 

  • কতরূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি, বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া। (কবিতা- স্বদেশ)
  • আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়। (কবিতা -বড় কে)
  • নগরের লোক সব এই কয় মাস। তোমর কৃপায় করে মহাসুখের বাস। (কবিতা- তপসে মাছ)

 

‘অবক্ষয় যুগ’ তথা যুগসন্ধিক্ষণের ফসল হিসাবে হিন্দুদের মধ্যে কবিগান ও মুসলমানদের মধ্যে পুথিঁ সাহিত্যের উদ্ভব হয়েছে। হিন্দু সমাজে কবিগানের রচয়িতাদের কবিওয়ালা এবং মুসলমান সমাজে মিশ্র ভাষারীতির পুথিঁ রচয়িতাদের ‘শায়ের’ বলা হত। কবিওয়ালা এবং শায়েরের উদ্ভব হয়েছে আঠারো শতকের শেষার্ধে ও উনিশ শতকের প্রথমার্ধে।

 

কবিগান

কবিগান দুই পক্ষের বির্তকের  মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হতো। দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতাই এর বৈশিষ্ট্য। কবিওয়ালারা ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু। এরা মূলত গায়ক ছিলেন এবং অর্থের বিনিময় জনমনোরঞ্জন করতেন। কবিওয়ালাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন – গোঁজলা গুঁই, ভবানী বেনে, ভোলা ময়রা, হরু ঠাকুর, কেষ্ট মুচি, এন্টনি ফিরিঙ্গি, রামবসু, রাম-নৃসিংহ, নিতাই বৈরাগী, শ্রীধর কথক, নীলমণিপাটনা, বলরাম বৈষ্ণব, রামসুন্দর স্যাকরা প্রমুখ। ‘গোঁজলা গুঁই’ ছিলেন কবিগানের আদি গুরু।

পুঁথি সাহিত্য

পুঁথি সাহিত্য অষ্টাদশ শতকের দ্বিকীয়ার্ধে রচিত ‘আরবি-ফারসি’ শব্দ মিশ্রিত ইসলামি চেতনাসম্পৃক্ত সাহিত্যকে পুঁথি সাহিত্য বলা হয়। কেই কেই এই শ্রেণির কাব্যকে ‘আরবি-ফারসি’ শব্দের প্রাচুর্যপূর্ণ ব্যবহারের জন্য ‘দোভাষী পুথিঁ’ নামে অভিহিত করেন। কিন্তু এতে মাত্র দটি ভাষার শব্দ নয় বরং কয়েকটি ভাষার শব্দ (বাংলা-হিন্দি-আরবি-ফারসি-তুর্কি) ব্যবহার হয়েছে। কলকাতার সস্তা ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত হয়ে এই ধারার কাব্য দেশময় প্রচারিত হয়েছিল বলে ‘বটতলার পুথিঁ’ নামেও একে চিহিত করার প্রচেষ্টা চলেছে। পুঁথিসাহিত্য সাহিত্য ধারার উল্লেখ্যযোগ্য কবি নিম্ন:

 

ফকির গরীবুল্লাহ : পুঁথি সাহিত্যের প্রথম সার্থক ও জনপ্রিয় কবি। মিশ্র ভাষারীতিতে তাঁর রচিত কাব্য হচ্ছে: ‘আমীর হামজা’ (প্রথম অংশ), ‘জঙ্গনামা’, ‘ইউসুফ জোলেখা’ ‘সোনাভান’, ‘সত্যপীরের পুঁথি’।

 

কবি কৃষ্ণরাম দাস: বিখ্যাত কাব্য ‘রায়মঙ্গল’।

 

সৈদয় হামজা  : মিশ্র ভাষারীতিতে তাঁর রচিত কাব্যগুলো হচ্ছে : ‘আমীর হামজা’ (২য় খন্ড), জৈগুনের পুঁথ ‘, হামেত তাই’। তাঁর ‘মধুমালতী’ কাব্যটি পুঁথি সাহিত্যের অনুসারী নয়, কবি সম্ভবত ফরাসি কাব্য থেকে বঙ্গানুবাদ করে এ কাব্যের রূপ দেন।

 

এছাড়াও মালে মুহম্মদ, মুহম্মদ খাতের, আবদুর রহিম নামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

পুঁথি সাহিত্য ও কবিগানের সমসাময়িক বিভিন্ন কবিতা ও গানের পরিচয় মেলে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য – টপ্পাগান।

 

টপ্পাগান

টপ্পা এক ধরনের গান। কবিগানের সমসাময়িককালে কলকাতা ও শহরতলীতে টপ্পাগান নামে রাগ-রাগিনী সংযুক্ত এক ধরনের ওস্তাদি গানের প্রচলন ঘটেছিল।হিন্দি টপ্পাগান এর আর্দশ। বাংলা টপ্পা গানের জনক ছিলেন নিধু বাবু বা রামনিধি গুপ্ত। টপ্পা থেকেই আধুনিক বাংলা গীতিকবিতার সূত্রপাত হয় বলে অনেকের ধারনা। নিধু বাবুর একটি চমৎকার বন্দনা-

 

“নানান দেশের নানান ভাষা।

 বিনে স্বদেশীয় ভাষা পুরে কি আশা।” (স্বদেশী ভাষা)

 

পাঁচালী গান

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে পাঁচালী গান এদেশে জনপ্রিয় হয়েছিল। পাঁচালী রচয়িতাদের মধ্যে শক্তিশালী কবি ছিলেন দাশরথি রায়।দাশুরায় নামে তিনি খ্যাত।

 

শাক্ত পদাবলি বা শ্যামাসঙ্গীত

শাক্ত পদাবলি হিন্দু দেবী শ্যামা বা শক্তির উদ্দেশ্যে রচিত এক প্রকার ভক্তিগীতি। এর অপর নাম শাক্তগীতি।দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে বাংলায় বৈষ্ণবধর্মের পাশাপাশি শাক্তধর্মের উদ্ভব ঘটে এবং তাকে কেন্দ্র করেই শাক্তগীতি চর্চার একটি ক্ষীণ ধারা প্রচলিত হয়। আঠারো শতকের মধ্যভাগে সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন (১৭২০-১৭৮১) এতে প্রাণ সঞ্চার করে বাংলা গানের জগতে ‘শাক্ত পদাবলি’ বা ‘শ্যামাসঙ্গীত’ নামে একটি বিশেষ সঙ্গীতধারা প্রতিষ্ঠিত করেন।