মাইকেল মধূসুধন দত্ত

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

উনবিংশ শতকের বিখ্যাত কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ২৫শে জানুয়ারি ১৮২৪ সালে যশোরের কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তিনি ছিলেন কবি ও নাট্যকার।১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করেন।তিনি ব্যারিস্টারি পাশ করেছিলেন তবে এ পেশায় ভালো করতে পারেননি। তিনি একাধারে বাংলা, ইংরেজী, গ্রিক, ল্যাটিন, সংস্কৃত, হিব্রু, পারসি, জার্মান, ইটালি, তামিল ও তেলেগু ভাষায় দক্ষ ছিলেন। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতার আলিপুর হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলা সাহিত্যে তার অবদান

বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের প্রধান অবদান মহাকাব্য রচনা। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকবি তিনি। মধুসূদন বাংলা কাব্যে আধুনিকতার প্রানপুরুষ বা প্রথিকৃৎ।তাঁকে আধুনকি বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবিও বলা হয়। বাংলা সাহিত্যে প্রথম সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক তিনি।তাঁ সনেটে প্রবল দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। তিনি বাংলা নাটকের পথিকৃৎও বটে। তাঁর ছদ্মনাম ‘Timothy Penpoen’।

মহাকাব্য

মেঘনাদবধ কাব্য: বাংলা সাহিত্যের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রচিত হয় ১৮৬১ সালে। একই বছর এটি প্রকাশিত হয়। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম কাব্যও বটে। এই কাব্যে মধুসূদনের প্রবল দেশপ্রেমের প্রকাশ পেয়েছে। অমিত্রাক্ষরে রচিত এ কাব্যে সর্গ সংখ্যা ৯টি। এই মহাকাব্যের কাহিনীর উৎস সংস্কৃত মহাকাব্য রামায়ণ।এটি একটি বীররসের কাব্য। ১৮৫৭ সালে সংগঠিত সিপাহি বিপ্লবের স্বাধীনতামন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে রাবনকে নায়ক ও রামকে খলনায়ক করে এটি রচনা করেন মধুসূদন দত্ত।এর প্রধান চরিত্রগুলো হল- মেঘনাদ, প্রমীলা, ইন্দ্রজিৎ,রাম, লক্ষ্ণন, সীতা, রাবণ, বিভীষণ, বিভীষনের স্ত্রী সরমা। ‘মেঘনাদবদ’ কাব্য ইংরেজিতে অনুবাদ করেন রাজনারায়ণ বসু।

এই কাব্যে-

‘যুদ্ধের সময় পশ্চিম দুয়ারে রক্ষকহিসেবে ছিলেন বীর নীল।’

‘আমি কি ডরাই সখি ভিখারী রাঘবে?’ এখানে ‘ভিখারী রাঘব’ বলতে রামকে বুঝানো হয়েছে।

আর অরিন্দম বলতে রাবণপুত্র ইন্দ্রজিতকে বুঝানো হয়েছে।

 

হেক্টরবধ: এচি হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের বঙ্গানুবাদ।এটি অসমাপ্ত অবস্থায় ১৯৭১ সালে প্রকাশ পায়।এটি তিনি ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করেন।

এছাড়াও তিনি কারবালার কাহিনি নিয়ে একটি মহাকাব্য লিখতে চেয়েছিলেন।

কাব্যগ্রন্থ

The Captive Lady (১৮৪৯): মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ এটি। এটি তিনি ইংরেজীতে লিখেন। Captive অর্থ বন্দি।ত্র আরেকটি ইংরেজী কাব্য Vision of the Past।

তিলোত্তমাসম্ভব (১৮৬০): বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম গ্রন্থ তিলোত্তমাসম্ভব।অবশ্য কবি ‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০) নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক, দ্বিতীয় গর্ভাঙ্গে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন।কিন্তু গ্রন্থ হিসেবে ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ প্রথম পূণার্ঙ্গ গ্রন্থ যাতে অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার হয়েছে।এটি কাহিনী কাব্য।

চতুর্দশপদী কবিতাবলী: ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ১০২টি সনেটের সংকলন। এটি বাংলা সাহিত্যে প্রথম সনেট বা সনেট গ্রন্থ। মাইকেল মধুসূদনের আগে কেই সনেট কবিতা বা সনেট  গ্রন্থ রচনা করেননি। এজন্য মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বাংলা সনেট কবিতার জনক বলা হয়।এই সনেট কবিতাগুলো ইতালীয় কবি পেত্রার্ক এবং শেক্সপীয়রের অনুকরনে রচিত।

বীরাঙ্গনা (১৮৬২): বীরাঙ্গনা বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রকাব্য।এখানে মোট ১১টি পত্র আছে। এই গ্রন্থ রচনার জন্য সমকালে তিনি নিন্দিত হয়েছেন।

ব্রজাঙ্গনা: রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক বৈষ্ণব পদাবলির আধুনিক পরিণতি।এটি তিনি বিরহ ও মিলন এই দুইখন্ডে রচনা করেন।

 

কবিতা

বঙ্গভাষা:অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত এই কবিতাটির প্রথম নাম ছিল ‘কবি-মাতৃভাষা’। কবিতাটিতে তার মাতৃভাষার প্রতি উপেক্ষার অনুতাপ ফুটে উঠেছে।এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সনেট। ‘বঙ্গভাষা’ অষ্টক ও ষটকে বিভক্ত।সনেটে ষটকের মিলবিন্যাস –গঘঘগঙঙ।

        হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিদ রতন;-

        তা সবে, (অবোধ আমি!)অবহেলা করি,

        পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

        পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

 

কপোতাক্ষ নদ: ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ কাব্যগ্রন্থের অর্ন্তগত একটি সনেট জাতীয় কবিতা ‘কপোতাক্ষ নদ’।এই কবিতাটি তিনি ফ্রান্সে বসে কপোতাক্ষ নসদকে স্মৃতিচারণ করে লিখেন।

        সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে।

        সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।

        ………………………………………….

        বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,

        কিন্তু সে স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার চলে?

 

নাটক

 

শর্মিষ্ঠা (১৯৫৮): মাইকেলের প্রথম বাংলা প্রকাশিত নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’।প্রধান চরিত্র: যযাতি, দেবযানী, শর্মিষ্ঠা, মাধব্য, পূর্ণিমা।

পদ্মাবতী (১৮৬০): বাংরা সাহিত্যের প্রথম সার্থক কমেডি নাটক পদ্মাবতী।এই নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে প্রথম তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন।এটি একটি পৌরণিক নাটক।

কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১): বাংরা সাহিত্যের প্রথম ট্রাজেডি নাটক।এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ নাটক। এর কাহিনী উইলিয়াম টডের ‘রাজস্থান’ নামক গ্রন্থ হতে সংগৃহীত। প্রধান চরিত্র: কৃষ্ণকুমারী, মদনিকা, ভীমসিংহ, জগৎসিংহ, ধনদাস।

সুলতানা রিজিয়ার বীরত্বপূর্ণ কাহিনি নিয়ে ইংরেজীতে তাঁর একটি অসম্পূর্ণ নাটক রিজিয়া।

প্রহসন

 

বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো (১৮৫৯): বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রহসন।এর প্রথম নাম ছিল ‘ভগ্ন শিবমন্দির’।এর প্রধান চরিত্র ভক্তপ্রসাদ বাবু।

মাইকেলের অন্য প্রহসনটির নাম ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ (১৮৫৯)।

তার কবিতার বিখ্যাত উক্তি:

‘জম্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে,

চিরস্থির কবে নীর, হায় রে,জীবন-নদে?’ (বঙ্গভূমির প্রতি)

 

‘উর্ধ্ব শির যদি তুমি কুল মনে ধনে;

করিওনা ঘৃণা তব নীচ শির জনে। (রসাল ও স্বর্ণলতিকা।)

 

মধুসূদন সম্পাদিত প্রত্রিকা: Eurasian এবং Madras Hindu Chronicle. সহকারী সম্পাদক হিসেবে Madras Spectator.

মধুসূধনের প্রথম জীবনী গ্রন্ধ লিখেন যোগীন্দ্রনাথ বসু। এর নাম ছিল ‘মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত’।