মুসলিম শাসন

মুসলিম শাসন

উমাইয়া খলিফা বিন আব্দুল মালিকের শাসনকালে মুসলমানদের বিজরাভিজান শুরু হয়। তাঁর সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর সমগ্র উত্তর আফ্রিকা এবং তারিক স্পেন জয় করে। খলিফা ওয়ালিদের রাজত্বকালে  হাজ্জাজ বিন ইউসুফ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি ৭১২ সালে তাঁর জামাতা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে ব্রাহ্মণাবাদে সিন্ধু রাজা দাহির শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের অকালমৃত্যু কারণে উপমহাদেশে ইসলামের আর্বিভাব ঘটে।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্দু বিজয়ের প্রায় ৩০০ বছর পর গজনীর সুলতান মাহমুদ ১০০০ সাল থেকে ১০২৭ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে ১৭ বার অভিযান পরিচালনা করেন।

ভারতে মুসলিম শাসন

ময়েজউদ্দিন মোহাম্মদ বিন সামস ইতিহাসে শিহাবউদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরী নামে পরিচিত। কিছু ঐতিহাসিক তাকে ঘুরীদের পারসিক জাতি বলে অভিহিত করলেও ঐতিহাসিক লেনপুল তাদের আফগান জাতির বংশধর বলে অভিহিত করেন।গজনীতে ঘুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে মুহাম্মদ ঘুরী উপমহাদেশে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন।

১১৯১ সালে মুহাম্মদ ঘুরী পৃথ্বিরাজ চৌহানের বিরুদ্ধে প্রথম তরাইনের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও আহত হয়ে স্বদেশে ফিরে যান। পরের বছর ১১৯২ সালে তিনি পুনরায় চৌহানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং জয়লাভ করেন। পৃথ্বিরাজ চৌহান এ যুদ্ধে নিহত হন এর ফলে উপমহাদেশে বা ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মদ ঘুরী উপমহাদেশের ভার তার সুযোগ্য সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেকের উপর দিয়ে গজনী ফিরে যান।

দিল্লি সালতানাত

দাস বংশ

কুতুবুদ্দিন আইবেক

কুতুবুদ্দিন আইবেক ছিলেন মুহাম্মদ ঘুরীর একজন ক্রীতদাস হিসেবে জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি মুহাম্মদ ঘুরীর সেনাপতি হন।তিনি মুহাম্মদ ঘুরীর অনুমতিক্রমে ভারত বিজয়ের পর দিল্লীতে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করেন। উপমহাদেশে স্থায়ীভাবে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন কুতুবুদ্দিন।এজন্য কুতুবুদ্দিন আইবেককে দাস বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিনি ছিলেন তুর্কিস্থানের অধিবাসী। এজন্য কুতুবুদ্দিন ও তার উত্তরাধিকারীদের শাসনামলকে প্রাথমিক যুগের তুর্কী শাসনও বলে চিহিৃত করা হয়ে থাকে।দানশীলতার জন্য তাকে ‘লাখবক্স’ বলা হতো। দিল্লির কুতুবমিনার নামক সুউচ্চ মিনারটি তাঁর আমলেই নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তিনি মিনারটির কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। দিল্লির বিখ্যাত সাধক কুতুবউদ্দিনের নির্মাণ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ারের কাকির নামানুসারে এর নাম রাখা হয় কুতুবমিনার।

সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুতমিশ

কুতুবুদ্দিন আইবেকের জামাতা ছিলেন ইলতুতমিশ।তিনি ছিলেন প্রাথমিক যুগে তুর্কী সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।তাকে দিল্লী সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ভারতে মুসলমান শাসকদের মধ্যে তিনি প্রথম মুদ্রা প্রচলন করেন। তিনি কুতুবমিনার নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন।

সুলতানা রাজিয়া

ইলতুতমিশের কন্যা সুলতানা রাজিয়া ১২৩৬ সালে দিল্লীর সিংহাসনের আরোহণ করেন।তিনি ছিলেন দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণকারী প্রথম মুসলমান নারী।

সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ

সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ অত্যন্ত ধর্মভীরু লোক ছিলেন।সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনের জন্য তিনি ফকির বাদশাহ নামে পরিচিত ছিলেন।তিনি কুরআন নকল ও টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বিদ্যোৎসাহী ও গুণীজনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ‘ভারতের তোতা পাখি’ নামে পরিচিত আমীর খররু বলবনের দরবার অলংকৃত করেন।

খলজী বংশ

আলাউদ্দিন খলজী

আলাউদ্দিন খলজী ১২৯৬ সালে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন।পর্যটক ইবনে বতুতা আলাউদ্দিন খলজীকে দিল্লীর শ্রেষ্ঠ সুলতান বলে অভিহিত করেছেন।আলাউদ্দিন খলজী জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য দ্রব্যের মূল্য নির্দিষ্ট হারে বেধে দেন।তিনি মূল্য ও বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রর্বতন করেন।আলাউদ্দিন খলজী শিল্পানুরাগী ছিলেন। বিখ্যাত আলাই দরওয়াজা তাঁরই কীর্তি।ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনী, কবি হোসেন দেহলবী, কবি আমির খসরু প্রমুখ গুণীজন তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।তিনি প্রথম মুসলমান শাসক হিসাবে দক্ষিন ভারত জয় করেন।তিনি ১৩০৬  তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুর  সালে সর্বপ্রথম দক্ষিণাত্যের দেবগিরির রাজা রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেবগিরির রাজা দিল্লীর আনুগত্য স্বীকার করেন।

তুঘলক বংশ

মুহাম্মদ বিন তুঘলক

মুহাম্মদ বিন তুঘলক অত্যন্ত প্রতিভাবান শাসক ছিলেন।তিনি ১৩২৫ সালে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন।রাজ্য শাসনের প্রত্যক্ষ অসুবিধা দূর করার জন্য ১৩২৬-২৭ সালে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী দিল্লী থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর করেন।কিন্তু নানাকারনে কর্মচারীদের দেবগিরি পছন্দ না হওয়ায় ও উত্তর ভারতে মঙ্গলদের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পুনরায় দিল্লীতে রাজধানী ফেরত আনেন। তিনি সোনা ও মুদ্রার পরিবর্তে প্রতীকী তামার মুদ্রা প্রচলন করে মুদ্রামান নির্ধারণ করেন। কিন্তু প্রতীক মুদ্রা জাল না হওয়ার জন্য যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা সে যুগে ছিলনা।এর ফলে ব্যাপকভাবে মুদ্রা জাল হতে থাকে। এ জন্য সুলতানকে এ পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হয়।

মাহমুদ শাহ

তুঘলক বংশের শেষ সুলতান ছিলেন মাহমুদ শাহ। বিখ্যাত তুর্কি বীর তৈমুর বেগ ছিলে মধ্য এশিয়ার সমরখন্দের অধিপতি। শৈশবে তার একটি পা খোড়া হয়ে যায় বলে তিনি তৈমুর লঙ নামে অভিহিত হন।সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি ১৩৯৮ সালে ভারত আক্রমণ করেন। তাকে বাধা দেওয়ার শক্তি মাহমুদ শাহের ছিলনা। তিনি বিনা বাধায় দিল্লিতে প্রবেশ করেন। প্রায় তিন মাস ধরে অবাধে হত্যা ও লুন্ঠন করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ নিয়ে স্বদেশে ফেরেন।তিনি একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করিয়ে যান যার নাম তুজুক ই তৈমুরী।

খান জাহান আলী

হযরত উলুঘ খান জাহান আলী ছিলেন বিশিষ্ট ধর্ম প্রচারক ও বাংলাদেশের বাগেরহাটের একজন স্থানীয় শাসক।তাঁর অন্যান্য নামের মধ্যে রয়েছে উলুঘ খান, খান-ই-আজম তিনি ১৩৬৯ সালে দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। খান জাহান আলী ১৩৮৯ সালে সেনাবাহিনীতে সেনাপতি পদে যোগদান করেন। তিনি রাজা গণেশকে পরাজিত করে বাংলার দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে ইসলামের পতাকা ওড়ান। তিনি বাগেরহাট জেলার বিখ্যাত ষাটগম্ভুজ মসজিদের নির্মাণ করেন।তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে (১৪৩৫-১৪৫৯ খিঃ) এটি নির্মাণ করেন।মসজিদের নাম ষাটগম্ভুজ হলেও এর মোট গম্ভুজ ৮১ টি।মসজিদের ভিতরে ষাটটি স্তম্ভ আছে। মসজিদের চার কোনায় চারটি পিলার রয়েছে। এটি বাংলাদেশে মধ্য যুগের সবচেয়ে বড় মসজিদ।১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো ষাটগম্ভুজ মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষনা করেন।

খানজাহানের প্রথম স্ত্রীর নাম সোনা বিবি। কথিত আছে সোনা বিবি ছিলেন খানজাহানের পির নুর-কুতুবুল আলমের একমাত্র কন্যা। খানজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী রূপা বিবি ওরফে বিবি বেগনি ধর্মান্তরিত মুসলমান ছিলেন। খানজাহান আলি তাঁর দুই স্ত্রীর নাম অনুসারে সোনা মসজিদ এবং বিবি বেগনি মসজিদ নামে মসজিদ নির্মাণ করেন।

লোদী বংশ

ইব্রাহীম লোদী

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ১৫২৬ সালে বাবরের কাছে দিল্লীর লোদী বংশের সর্বশেষ সম্রাট ইব্রাহীম লোদী পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দিল্লীর সালতানাতের পতন হয়।

মুঘল সাম্রাজ্য

জহিরদ্দিন মুহম্মদ বাবর ১৫২৬ সালে ইব্রাহীম লোদীকে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

পানিপথের যুদ্ধ

পানিপথ উত্তর-পশ্চিম ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের একটি শহর। এটি দিল্লি থেকে ৯০ কিমি. উত্তরে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত।এখানে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে পানিপথের যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

যুদ্ধ পানিপথের প্রথম যুদ্ধ পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ
প্রতিপক্ষ বাবর আকবরের সেনাপথি বৈরাম খান আহমদ শাহ আবদালি
ইব্রাহীম লোদী আফগান নেতা হিমু মারাঠা
সময়কাল ১২ এপ্রিল, ১৫২৬ ১৫৫৬ সাল ১৭৬১ সাল
ফলাফল ইব্রাহীম লোদী পরাজিত ও নিহত হন। আকবর দিল্লি অধিকার দিল্লি অধিকার করেন। হিমু পরাজিত ও নিহত হন।আকবর দিল্লি অধিকার দিল্লি অধিকার। মারাঠা শাসকদের পেশোয়া বলে।আহমদ শাহ আবদালি মারাঠাদিগকে পরাজিত করেন।

 

মসলিন কাপড়

মসলিন তুলার আশ থেকে প্রস্তুত করা একধরনের কাপড় বিশেষ। মসলিন ছিলো মুঘল সম্রাটদের বিলাসের বস্তু।

মুঘল সম্রাটদের বংশ তালিকা

জহির উদ্দিন বাবর

(মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা)

সম্রাট হুমায়ন

সম্রাট আকবর

সম্রাট জাহাঙ্গীর

সম্রাট শাহজাহান

সম্রাট আওরঙ্গজেব

সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ

(সর্বশেষ মুঘল সম্রাট)

 

জহির উদ্দিন বাবর

জহির উদ্দিন মুহাম্মদ তার সাহসিকতা ও নির্ভীকতার জন্য ইতিহাসে ‘বাবর’ নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেছিলেন।বর্তমান রুশ-তুর্কিস্থানের অন্তর্গত ফারগানায় বাবরের জন্ম।তিনি পিতার দিক থেকে তৈমুর লঙ  এবং মাতার দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। বাবর মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ‘তুযক-ই-বাবর’ বা বাবুরের আত্মজীবনী নামক গ্রন্থে বাবর তাঁর জীবনের জয়পরাজয়ের ইতিহাস লিখেন। ১৫২৭ সালে তিনি বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন।বাবরি মসজিদ ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা নগরীতে অবস্থিত। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্রবাদী হিন্দুগোষ্ঠী ঐতিহাসিক এই মসজিদ ভেঙ্গে পেলে।বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় তদন্তের জন্য গঠিত কমিশনের নাম লিবারহ্যান কমিশন। এ কমিশনের বিজেপি নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদভানি, কালয়ান সিং সহ ৬৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

নাসির উদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ন 

বাবরের মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ন ১৫৩০ সালে দিল্লীর সিংহাসন লাভ করেন।তিনি ১৫৩৮ সালে বাংলায় প্রবেশ করেন এবং গৌড় অধিকার করেন।তিনি গৌড় নগরের অপরূপ সৌন্দর্য এবং জলবায়ু দেখে মুগ্ধ হন। তিনি গৌড়ের নাম পরিবর্তন করে রাখেন জান্নতাবাদ।তিনি বাংলায় ৮ মাস থেকে দিল্লীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।কিন্তু পথিমধ্যে বক্সারের নিকটবর্তী চৌসার নামক স্থানে শেরশোহ হুমায়নকে অর্তকিত আক্রমণ করেন।চৌসারের যুদ্ধে (১৫৩৯) পরাজিত হয়ে হুমায়ন কোনক্রমে প্রান নিয়ে দিল্লী পৌছাঁন। পরের বছর ১৫৪০ সালে শেরশাহর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন।কিন্তু কনৌজের নিকট বিলগ্রামের এ যুদ্ধে তিনি শোচনীয় ভাবে পরাজিত হন। বিজয়ী শেরশাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন।

শূর শাসন : শেরশাহ

১৫৩৯ সালে চৌসারের যুদ্ধে হুমায়নকে পরাজিত করে শেরখান ‘শেরশাহ উপাধি গ্রহণ করেন।তিনি নিজেকে বিহারের স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষনা করেন। তিনি হুমায়নকে পরাজিত করে দিল্লীর অধিকার নিয়ে উপমহাদেশে আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।শেরশাহ ‘সড়ক-ই-আজম’ নামে বাংলাদেশের সোনরগাঁও থেকে লাহোর পর্যন্ত ৪৮৩০ কি.মি র্দীঘ একটি মহাসড়ক নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ইংরেজরা এ সড়ক সংস্কার করে নাম দেন ‘গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড’।শেরশাহ কবুলিয়ত ও পাট্টার প্রচলন করেন। কৃষকগণ তাদের অধিকার ও দায়িত্ব বর্ণনা করে সরকারকে কবুলিয়ত নামে দলিল সম্পাদন করে দিত আর সরকারের পক্ষ থেকে জমির উপর জনগণের স্বত্ব স্বীকার করে পাট্টা দেওয়া হতো।শেরশাহ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ডাক ব্যবস্থার প্রচলন করেন। ডাক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য তিনি ঘোড়ার মাধ্যমে ডাক আনা নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।শেরশাহ মুদ্রা ব্যবস্থার  সংস্কার করেন। তিনি ‘দাম’ নামক রূপার মুদ্রার প্রচলন করেন।এখন বস্তুর মূল্যকে দাম বলা হয়।

হুমায়নের দ্বিতীয় অধ্যায়

পারস্যের সম্রাটের সাহায্যে হুমায়ন ১৫৫৫ সালের ২২ জুন সেরহিন্দের যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে শেরশাহকে পরাজিত করে তিনি আবার দিল্লীর অধিকার নেন। ১৫৫৬ সালে দিল্লীর অদূরে নিজের নির্মিত ‘দীন পানাহ’ দূর্গের পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে তিনি মারা যান।

সম্রাট জালাল উদ্দিন আকবর

১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মাত্র ১৩ বছর বয়সে আকবর দিল্লির সিংহাসনে বসেন। হুমায়নের মৃত্যুর পর বৈরাম খান আকবরের রাজ প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। এজন্য আকবর তাকে ভালোবেসে খান-ই-বাবা বলে ডাকতেন।হুমায়নের মৃত্যুর পর হিমু দিল্লির মুঘল শাসন কর্তাকে পরাজিত করে দিল্লী ও আগ্রা-র দখল নেন।১৫৫৬ সালে পানি পথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আকবর হিমুকে পরাজিত করে দিল্লীর অধিকার করেন।সম্রাট আকবরের সময়ই মুঘল সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তার লাভ করে। তিনি ১৫৭৬ সালে বাংলা জয় করেন। অমুসলিমদের উপর ধার্য সামরিক করকে জিজিয়া কর বলে। তিনি রাজপুত ও হিন্দুদের বন্ধুত্ব অর্জনের জন্য তীর্থ ও জিজিয়া কর রহিত করেন।১৫৮২ সালে তিনি সকল ধর্মের সার সংক্ষেপ ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামক নতুন একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রণয়ন করেন।

ভারতে ইসলামি শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে সকল কাজ করা হত। আকবর প্রচলিত চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌরপঞ্জিকায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিদ ওমর ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব দেন।ওমর ফতুল্লাহ শিরাজীর সুপারিশে সম্রাট আকবর ৯৯২ হিজরী (১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে) – এ বাংলা সৌর  বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তন করেন।তবে তিনি ২৯ বছর পূর্বে  সিংহাসনে আরোহণের দিন থেকে এ  পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন।এজন্য তিনি ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু করেন।

আকবর মনসবদারী প্রথা চালু করেন। অম্বরের রাজা ভর মল্লের কন্যা জোধাবাঈ-এর সাথে তার বিবাহ হয়। ভর মল্লের পুত্র রাজা ভগবন দাস আকবরের সভায় নবরত্নের একজন ছিলেন। ভগবন দাসের পুত্র রাজা মান সিংহ আকবরের বিশাল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। রাজা টোডর মল্ল ছিলেন আকবরের অর্থমন্ত্রী। আরেক রাজপুত, বীরবল, ছিলেন আকবরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও প্রিয়পাত্র। 

সম্রাটের রাজসভার সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবুল ফজল, ফৈজী, টোডরমল, বীরবল, মানসিংহ উল্লেখযোগ্য। রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল রাজস্ব ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। আকবরের সভাসদ আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরী’ নামক গ্রন্থে দেশবাচক বাংলা শব্দ ব্যবহার করেন।

 আকবরের রাজ সভার গায়ক ছিলেন তানসেন।তানসেন কে ‘বুলবুল-ই-হিন্দ’ বলা হতো। আকবরের রাজসভার বিখ্যাত কৌতুককার ছিলেন বীরবল। ১৬০৫ সালে সম্রাট আকবর মৃত্যুবরণ করেন।তাঁকে আগ্রার সেকেন্দ্রায় সমাহিত করা হয়। মুঘল আমলে সরকার কর্তৃক আরোপিত নিয়মিত করের অতিরিক্ত সকল সামরিক ও অসামরিক এবং অন্যান্য অর্থকে বলা হতো আওয়াব।

সম্রাট সেলিম নূর উদ্দিন মুহম্মদ জাহাঙ্গীর     (১৬০৫-১৬২৭)

সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে নূরজাহানের বিবাহ মুঘল সম্রাজ্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নূরজাহান ছিলেন রূপবতী ও গুণববতী মহিলা। নূরজাহানের বাল্যনাম ছিল মেহেরুন নেছা। সম্রাট আকবর বাংলা জয় করলেও মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গীর’। তিনি এদেশের সরকারী কাজে ফারসি ভাষা চালু করেন। ১৬২৭ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর মৃত্যুবরণ করেন। তার সমাধি লাহোরে অবস্থিত।

 

শাহজাহান ওরফে খুররম (১৬২৮-১৬৫৮)

 

মমতাজ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী। শাহজাহান তাকে অত্যধিক ভালোবাসতেন। ১৬৩১ সালে সম্রাজ্ঞি মমতাজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সম্রাট তার প্রিয়তমার মৃত্যুতে গভীর আঘাত পান। তিনি আগ্রার যমুনা নদীর তীরে পত্নীপ্রেমের অক্ষয়কীর্তি ‘তাজমহল নির্মাণ করেন। মণিমুক্ত খচিত ‘ময়ূর সিংহাসন’ সম্রাট শাহজাহানের অমর সৃষ্টি। সম্রাট শাহজাহানের মুকুটে ‘কোহিনুর’ হীরা শোভা পেত। সম্রাট শাহজাহান দিল্লীতে লাল কেল্লা, জাম-ই-মসজিদ, দিওয়ান-ই-আম, দিওয়ান-ই-খাস, আগ্রার মতি মসজিদ এবং লাহোরের সালিমার উদ্যান নির্মান করেন। এজন্য তাঁকে ‘Prince of Builders’ বলা হয়।

সম্রাট আওরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭)

শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজের গর্ভে চারপুত্র ও দুইকন্যা জন্মগ্রহণ করেন। পুত্রদের নাম দারা, সুজা , আওরঙ্গজেব ও মুরাদ। কন্যাদের নাম ছিলো জাহান আরা ও রওশন আরা। ভ্রাতৃযুদ্ধে জাহান আরা দারার পক্ষে ও রওশন আরা আওরঙ্গজেবের পক্ষ সমর্থন করেন।যুদ্ধে অপর ভাইদের পরাজিত করে আওরঙ্গজেব ক্ষমতা দখল করেন। সম্রাট শাহজাহান তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেবকে যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘আলমগীর’ নামক তরবারি প্রদান করেন।সম্রাট আওরঙ্গজেব অতিশয় ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। তাই তাকে ‘জিন্দাপীর’ বলা হত। তিনি জিজিয়া কর পুনঃস্থাপন করেন।বাংলার সুবেদার মীর জুমলা ১৬৬১ সালে বিনা যুদ্ধে কুচবিহারকে মুঘল সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এ সময় কুচবিহারের নাম রাখা হয় আলমগীর নগর। আওরঙ্গজেব ‘আলমগীর’ বলা হত।

মুহম্মদ শাহ

দুর্বল ও অকর্মণ্য মুঘল সম্রাট মুহম্মদ শাহ এর আমলে (১৭৩৯ সালে) পারস্যের নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করেন।নাদিরশাহ ভারত হতে মূল্যবান কোহিনূর হীরা, ময়ূর সিংহাসন এবং প্রচুর পরিমাণ ধনরত্ন পারস্যে নিয়ে যান।

আহমদ শাহ আবদালীর ভারত আক্রমণ: আহমদ শাহ আবদালী নাদির শাহের সেনাপতি ছিলেন। তিনি সনাদির শাহের মৃত্যুর পর আফগানিস্থানের অধিপতি হন। তিনি মুহম্মদ শাহের রাজত্বকালে ভারত আক্রমণ করেন কিন্তু পরাজিত হন। এ পরাজয়ের শোধ নিতে তিনি আরো তিনবার ভারত আক্রমণ করেন।

 

** পানি পথের তৃতীয় যুদ্ধ:

প্রতিপক্ষ: আহমদ শাহ আবদালী এবং মারাঠা

সময়কাল : ১৭৬১

স্থান : দিল্লীর অদূরে পানিপথের প্রান্তর

ফলাল: আহমদ শাহ আবদালী মারাঠিদেরকে পরাজিত করেন।

 

দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ

দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট। সিপাহী বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে তাঁকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন) নির্বাসন দেওয়া হয়। ১৮৬২ সালে তিনি রেঙ্গুনে নির্বাসিত অবস্থায় মারা যায়। রেঙ্গুনেই তাকে সমাহিত করা হয়।

 

বাংলায় মুসলিম শাসনপ্রতিষ্ঠা

 

বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়

মুহম্মদ ঘুরীর সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেকের অনুমতিতে তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন খলজী ১২০৪ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন রাজা লক্ষন সেনকে পরাজিত করে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। তিনি দিনাজপুরের দেবকোটে বাংলার রাজধানী স্থাপন করেন।

 

বাংলায় তুর্কী শাসন

বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্যায় ছিল ১২০৪ সাল হতে ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত। এ যুগের শাসনকর্তারা সকলেই দিল্লির সুলতানের অধীনে বাংলার শাসনকর্তা হয়ে এসেছিলেন।অনেক শাসনকর্তাই দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন। তবে এদের বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত দিল্লীর আক্রমণের মুখে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

ঘন ঘন বিদ্রোহ সংঘঠিত হওয়ার কারণে ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানী বাংলার নাম দিয়েছিলেন ‘বলগাকপুর’ বা বিদ্রোহের নগরী।

হযরত শাহজালাল (রাঃ)

হযরত শাহজালাল ছিলেন প্রখ্যাত দরবেশ ও ইসলাম প্রচারক। তিনি ১২৭১ সালে ইয়মেনে (মতান্তরে তুরস্কে) জন্মগ্রহণ করেন। বিখ্যাত সুফী শাহপরান ছিলেন তার ভাগ্নে এবং শিষ্য।সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজের শাসনামলে তিনি ৩৬০ জন শিষ্যসহ বাংলাদেশে আসেন।এ সময় সিলেটের রাজা ছিলেন গৌর গোবিন্দ। সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজের সৈন্যদল দু’বার সিলেট জয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শাহজালাল শামসুদ্দিন ফিরোজের সৈন্যদের সাথে গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান করেন। গৌর গোবিন্দ পরাজিত হয়ে সিলেট ত্যাগ করে জঙ্গলে আশ্রয় নেন। ঐ অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে আসে।তিনি গৌর গোবিন্দকে পরাজিত করে সিলেটে আযান ধ্বনি দেন। শাহজালাল মৃত্যু অবধি সিলেটে অবস্থান করেন এবং তিনি এই অঞ্চলে ইসলাম বিস্তারে ভূমিকা রাখেন।উল্লেখ্য, শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার সিলেটে অবস্থিত। হযরত শাহজালালের তরবারি সিলেটের মাজারে সংরক্ষিত আছে।

 

বাংলায় স্বাধীন সুলতানী শাসন

দিল্লীর সুলতানগণ ১৩৩৮-১৫৩৮ এই দুইশত বছর বাংলাকে তাদের অধিকারে রাখতে পারেনি। এ সময় বাংলার সুলতানরা স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করেন।

 

ফখরুদ্দিন মুবারক শাহী শাসন (১৩৩৮-১৩৪৯)

ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের পূর্ণনাম ফকরা। ১৩৩৮ সালে তিনি সোনারগাঁয়ের শাসন ক্ষমতা দখল করেন ও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীন সুলতান হিসেবে তিনি উপাধি গ্রহণ করেন ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান। তবে তিনি পুরো বাংলা দখল করতে পারেননি।

ইবনে বতুতার বর্ণনা:

মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের শাসনামলে বাংলায় আসেন।বাংলাদেশে আসার তাঁর মূল কারন ছিল সিলেটে গিয়ে হযরত শাহজালালের সাথে সাক্ষাত করা। ইবনে বতুতা দক্ষিন ভারত থেকে সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম আসেন। চট্টগ্রাম বন্দরে অবতরণ করে তিনি হযরত শাহজালালের সাথে সাক্ষাত করতে সিলেটে যান। তার পর নদী পথে সিলেট থেকে সোনারগাঁয়ে আসেন। ইবনে বতুতা প্রথম বিদেশী হিসেবে ‘বাঙ্গালা’ শব্দটি ব্যবহার করেন।জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যাদির প্রচুর ও স্বল্পমূল্য আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী তাকে আকৃষ্ট করলেও এদেশের আবহাওয়া তাঁর পছন্দ হয়নি। এজন্য তিনি বাংলাদেশের নামকরণ করেন ‘দোযখপুর আয নিয়ামত’ বা আর্শীবাদপুষ্ট নরক বা ধনপূর্ণ নরক। তার ‘কিতাবুল রেহেলা’ নামক গ্রন্থে বাংলার অপরূপ বর্ণনা দেওয়া আছে।

 

ইলিয়াস শাহী শাসন

 

সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৭)

সুলতান ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ সালে সমগ্র বাংলা অধিকার করেন। এজন্য দিল্লির ঐতিহাসিক শামস-ই-সিরাজ আফীফ তাকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ বা শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান’ বলে উল্লেখ করেন। তার সময় সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল ‘বাঙ্গালা’ নামে পরিচিত হয়ে উঠে। ইলিয়াস শাহ বাংলার রাজধানী গৌড় থেকে পাণ্ডুয়া নগরীতে স্থানান্তর করেন। তাঁর রাজত্বকালে বিখ্যাত সুফী সাধক শেখ শিরাজ উদ্দিন ও শেখ বিয়াবানী বাংলায় এসেছিলেন। শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের সময় বাংলার সবগুলো জনপদ একত্রে বাংলা নামে পরিচিতি লাভ করে। এ জন্য তাকে বাংলার প্রথম জনক বলা হয়।

 

সুলতান সিকান্দার শাহ (১৩৫৭-১৩৯৩)

সুলতান সিকান্দার শাহ ইলিয়াস শাহের পর ১৩৫৭ সালে বাংলার সুলতান হন। পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ সুলতান সিকান্দার শাহের অমর কীর্তি।

 

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ (১৩৯৩-১৪১১)

এ যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ। আযম শাহ বাংলা ভাষার পরম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর সময়ে বাঙালি প্রথম মুসলিম কবি শাহ মুহম্মদ সগীর তাঁর কাব্য ‘ইউসুফ জোলেখা’ রচনা করেন।তিনি সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। পারস্যের কবি হাফিজের সাথে তাঁর পত্রালাপ হত।একবার তিনি কবি হাফিজকে বাংলায় আসার দাওয়াত জানালে প্রতুত্তরে কবি হাফিজ তাকে সুন্দর একটি কবিতা লিখে পাঠান। আজম শাহ চীনের সম্রাট ইউঙলোর সাথে রাজদূত বিনিময় করেন। তাঁর রাজত্বকালে চীনা পরিব্রাজক ‘মাহুয়ান’ বাংলায় আসেন।

 

হুসেন শাহী শাসন

আলাউদ্দিন হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)

বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ। হুসেন শাহের আমলে বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়। হুসেন শাহের রাজত্বকালে শ্রীচৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন।তাঁর শাসন আমলে বাংলা সাহিত্যের চরম উন্নতি হয়। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দী বাংলা ভাষায় মহাভারত রচনা করেন। হুসেন শাহী আমলে বাংলা গজল ও সুফী সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। বিপ্রদাস, বিজয়গুপ্ত, যশোরাজ খান প্রমুখ সাহিত্যিকগণ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় লাভ করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ ও গুমতিদ্বার নির্মিত হয়।

 

নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ (১৫১৯-১৫৩২)

গৌড়ের বিখ্যাত বড় সোনা মসজিদ (বারদুয়ারি মসজিদ) এবং কদমরসুল ভবন সুলতান  নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহের অমর কীর্তি।

গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮)

বাংলার শেষ সুলতান ছিলেন গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ। ১৫৩৮ সালে শেরশাহ গৌড় দখল করেন এবং বাংলায় স্বাধীন সুলতানি যুগের অবসান হয়।

গুরুত্বপূর্ণ পরিব্রাজক

 

পরিব্রাজক: পরিব্রাজক অর্থ – ১) অনবরত পর্যটনকারী ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী ২) পর্যটক

 

পরিব্রাজকের নাম জাতীয়তা বাংলায় আগমনের সাল তৎকালীন শাসক
মেগাস্থিনিস গ্রীক খ্রিস্টপূর্ব ৩০২ প্রথম চন্দ্রগুপ্ত
ফা হিয়েন চীনা ৪০১-৪১০ সাল দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
হিউয়েন সাং চীনা ৬৩০ সাল হর্ষবর্ধন
ইবনে বতুতা মরক্কীয় ১৩৩৩ সালে ভারত আগমন দিল্লীর সুলতানঃ মোহাম্মদ বিন তুঘলক
১৩৪৫ সালে বাংলায় আগমণ বাংলার সুলতানঃ ফকরুদ্দিন মুবারক শাহ
মা-হুয়ান চীনা ১৪০৬ সালে গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ

 

 

মেগাস্থিনিস

মেগাস্থিনিস প্রাচীন গ্রিসের একজন পর্যটক এবং ভূগোলবিদ। তিনি এশিয়ার মাইনরে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রিক সেনাপতি সেলিউকাস খ্রিস্টপূর্ব ৩০২ অব্দে তাকে দূত হিসেবে প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজদরবারে প্রেরণ করেন।তিনি কয়েক বছর এদেশে অবস্থান করে মৌর্য শাসন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ‘ইন্ডিকা’ নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন।

ফা হিয়েন

ফা হিয়েন প্রাচীন চৈনিক তীর্থযাত্রী ছিলেন। তিনি মধ্য এশিয়া, ভারত এবং শ্রীলংকা ভ্রমণ করেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে তিনি ভারতে আসেন। তিনি ১০ বছর ভারতে অবস্থান করেন। ফা হিয়েন তার ভারতে অবস্থানকালে তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ৭ টি গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে ‘ফো -কুয়ো-কিং বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

হিউয়েন সাঙ

হিউয়েন সাঙ (Xuanzang) ছিলেন বিখ্যাত চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু, পন্ডি, পর্যটক এবং অনুবাদক। ৬৩০ সালের কোনো এক সময়ে তিনি ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিলেন। হর্ষবর্ধনের দরবারে তিনি আটবছর কাটান। শীলভদ্র বৌদ্ধ শাস্ত্রঙ্গ এবং দার্শনিক ছিলেন। তিনি নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। হিউয়েন সাঙ ২২ বছর ধরে শীলভদ্রের কাছে যাবতীয় শাত্র অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি ‘সিদ্ধি’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। নালন্দা ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত একটি প্রাচীন উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র। এটি বিহারের রাজধানী পাটনা থেকে ৫৫ কিঃমিঃ দক্ষিন-পূর্বে অবস্থিত।নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়টি গুপ্ত সম্রাট শত্রূদিত্যের (অপর নাম কুমার গুপ্ত) রাজত্বকালের। এই বিহারটি  এই নালন্দা মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়।১১৯৩ সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খলজী নালন্দা মহাবিহার ধ্বংস করে ফেলেন।

ইবনে বতুতা

মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের শাসনামলে বাংলায় আসেন।তিনি ছিলেন সুন্নি মুসলিম পর্যটক, চিন্তাবিদ এবং বিচারক। ১৩৩৩ সালে মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে তিনি ভারতবর্ষে আগমন করেন। সুলতানের সাথে পরিচয় ঘটলে তিনি ইবনে বতুতাকে কাঝী পদে নিযুক্ত করেন। ইবনে বতুতা অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ৮ বছর উক্ত পদে বহাল ছিলেন। অতঃপর সুলতানের বিরাগভাজন হয়ে কারারুদ্ধ হন। সুলতান তুঘলক দয়া পরবশ হয়ে এই বিদেশী পর্যটককে ক্ষমা করেন।ইবনে বতুতা ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের আমলে বাংলায় আসেন। বাংলাদেশে আসার তাঁর মূল কারন ছিল সিলেটে গিয়ে হযরত শাহজালালের সাথে সাক্ষাত করা। ইবনে বতুতা দক্ষিন ভারত থেকে সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম আসেন। চট্টগ্রাম বন্দরে অবতরণ করে তিনি হযরত শাহজালালের সাথে সাক্ষাত করতে সিলেটে যান। তার পর নদী পথে সিলেট থেকে সোনারগাঁয়ে আসেন। ইবনে বতুতা প্রথম বিদেশী হিসেবে ‘বাঙ্গালা’ শব্দটি ব্যবহার করেন।জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যাদির প্রচুর ও স্বল্পমূল্য আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী তাকে আকৃষ্ট করলেও এদেশের আবহাওয়া তাঁর পছন্দ হয়নি। এজন্য তিনি বাংলাদেশের নামকরণ করেন ‘দোযখপুর আয নিয়ামত’ বা আর্শীবাদপুষ্ট নরক বা ধনপূর্ণ নরক। তার ‘কিতাবুল রেহেলা’ নামক গ্রন্থে বাংলার অপরূপ বর্ণনা দেওয়া আছে।

মা হুয়ান

মা হুয়ান ছিলেন চীনা পরিব্রাজক। তিনি ১৪০৬ সালে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের আমলে উপমহাদেশে আসেন।

সিমা কিয়ান

সিমা কিয়ান ছিলেন চীনা পরিব্রাজক।তাকে চৈনিক লিখন ধারার জনক বলা হয়। তার সর্বশ্রেষ্ঠ ‘প্রধান ঐতিহাসিক দলিল’ যা চৈনিকের শিজি নামে অধিক পরিচিত।

 

বারভূঁইয়াদের ইতিহাস

সম্রাট আকবর পুরো বাংলার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। বাংলার বড় বড় জমিদাররা মুঘলদের অধীনতা মেনে নেয়নি। জমিদাররা তাদের নিজ নিজ জমিদারিতে স্বাধীন ছিলেন। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। বাংলার ইতিহাসে এ জমিদাররা বারভূঁইয়া নামে পরিচিত। এই বার বলতে বার জনের সংখ্যা বুঝায়না। ধারনা করা হয়, অনির্দিষ্ট সংখ্যক জমিদার বলতে বোঝাতেই বার শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমদিকে বারভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খাঁ। তিনি বাংলার রাজধানী হিসেবে সোনারগাঁওয়ের গোড়াপত্তন করেন। সম্রাট আকবরের সেনাপতিরা ঈসা খা ও অন্যান্য জমিদারের সাথে বহুবার যুদ্ধ করেছেন কিন্তু বারভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। ঈসা খাঁ মৃত্যুর পর বারভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁর ছেলে মুসা খান। এদিকে আকবরের মৃত্যুর পর মুঘল সম্রাট হন জাহাঙ্গীর। তাঁর আমলে বারভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে দমন করা হয়। এ সাফল্যের দাবিদার সুবেদার ইসলাম খান। তিনি বারভূঁইয়াদের নেতা মুসা খানকে পরাস্ত করেন ফলে অন্যান্য জমিদারগণ আত্মসমর্পণ করে। এভাবেই বাংলায় বারভূঁইয়াদের শাসনের অবসান হয়।

এগার সিন্ধুর দুর্গ ঈসা খাঁনের নামবিজড়িত মধ্যযুগীয় একটি দুর্গ। এটি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার অধীনে এগারোসিন্ধুর গ্রামে অবস্থিত। এগারোসিন্ধু শব্দটি এখানে এগারোটি নদী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল। এ দুর্গটি এই নামে পরিচিত হওয়ার কারণ এক সময় এটি অনেকগুলো নদীর (বানর, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ, গিয়র সুন্দা ইত্যাদি) সংযোগস্থলে অবস্থিত ছিল।

 

বাংলায় সুবেদারী শাসন

বারভূঁইয়াদের দমনের পর সমগ্র বাংলায় সুবেদারী প্রতিষ্ঠিত হয়। মুঘল প্রদেশগুলো ‘সুবা’ নামে পরিচিত। বাংলা ছিল মুঘলদের অন্যতম সুবা।

 

মোঘল সম্রাট বাংলার সুবেদার উল্লেখযোগ্য ঘটনা
 

 

 

 

 

 

 

 

সম্রাট জাহাঙ্গীর

 

 

 

 

 

 

 

 

ইসলাম খান(১৬০৮-১৬১৩)

১. বারভূঁইয়াদের দমন করে বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

২. সুবেদার ইসলাম খানই বাংলার রাজধানী হিসাবে ঢাকার গোড়াপত্তন করেন। তিনি ১৬১০ সালে সুবা বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থান্তরিত করেন। তিনি সম্রাটের নাম অনুসারে নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগরঅ

৩. তিনি ‘ধোলাইখাল’ খনন করেন।

৪. সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারের প্রথম দূত হিসেবে আসেন ক্যাপ্টেন হকিন্স।ক্যাপ্টেন হকিন্স ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের সুপারিশপত্র নিয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে ১৬০৮ সালে আগমণ করেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সম্রাট শাজাহান

 

 

 

কাসিম খান জুয়িনী

এসময় পতুগিজদের অত্যাচারের মাত্রা চরমে উঠলে সম্রাট শাজাহান তাদেরকে এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশে সুবেদার কাসিম খান পতুগিজদের হুগলি থেকে উচ্ছেদ করেন।
শাহ সুজা ১. শাহ সুজা ছিলেন সম্রাট শাজাহানের দ্বিতীয় পুত্র।তিনি ইংরেজদের বিনা শুল্কতে অবাধ বাণিজ্যের সুযোগ দেন।

২. ঢাকার চকবাজারের ‘বড় কাটরা’ নির্মাণ করেন। ঢাকার চকবাজারে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক অট্টালিকার নাম বড় কাটরা। ১৬৬৪ সালে বাংলার সুবাদার মুহাম্মদ সুজা এ অট্টালিকা নির্মাণ করেন।বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হওয়ার পর তার পরিবারের বসবাসের জন্য বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে একটি বাড়ি নির্মাণের আদেশ দেন। তার আদেশে প্রকৌশলী আবুল কাশিম এ বাড়িটি নির্মাণ করেন।

৩. ১৬৩৩ সালে সম্রাট শাজাহান থেকে ইংরেজরা ব্যবসা বাণিজ্য ও কুঠি নিমার্ণের সুযোগ পান।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সম্রাট আওরঙ্গজেব

 

 

 

 

 

মীর জুমলা(১৬৬০-১৬৬৩)

১. ঢাকা গেট নির্মাণ করনে মীর জুমলা।

২. তিনি আসাম যুদ্ধে যে কামান ব্যবহার করেন তা বর্তমানে ওসমানী উদ্যানে সংরক্ষিত আছে।

৩. মীরজুমলা ১৬৬১ সালে ১ নভেম্বরে ১২ হাজার অশ্বারোহী, ৩০ হাজার পদাতিক সৈন্য এবং ৩২৩ টি জাহাজ ও নৌকার বহর নিয়ে আসাম আক্রমণ করেন।

 

 

 

 

 

 

শায়েস্তা খান (১৬৬৪-১৬৭৮ এবং ১৬৭৯-১৬৮৮)

১. সুবেদার শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ থেকে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের বিতাড়িত নাম। তিনি চট্টগ্রামের নাম রাখেন ইসলামাবাদ।

২. সুবেদার শায়েস্তা খান স্থাপত্য শিল্পের জন্য বিখ্যাত। স্থাপত্য শিল্পের বিকাশের জন্য এই যুগকে বাংলায় মোঘলদের স্বর্ণযুগ  বলা হয়। ঢাকায় শায়েস্তা খান নির্মিত কীর্তিগুলো হল- ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটরা, লালবাগ কেল্লা, চক মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ।

৩. লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরে শায়েস্তা খানের কন্যা পরি বিবির সমাধি অবস্থিত।

৪. শায়েস্তা খানের কন্যা পরি বিবির আসল নাম ইরান দুখত। ১৬৮৪ সালে পরি বিবির মৃত্যু হলে লালবাগ দুর্গের অভ্যন্তরেই

শায়েস্তা খান তার সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন।

 

 

বাংলায় নবাবী শাসন

 

নবাব মুর্শিদকুলী খান (১৭১৭-১৭২৭)

সুবেদার মুর্শিদকুলী খানের সময় থেকে বাংলা সুবা প্রায় স্বাধীন হয়ে পড়ে। নবাব মুর্শিদকুলী খান বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব। নবাব মুর্শিদকুলী খান বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন।

নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-১৭৫৬)

আলীবর্দী খানের শাসনামলে মারাঠারা প্রতিবছর বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা আক্রমণ করত। মারাঠাদের আক্রমণকে বাংলার ইতিহাসে বর্গীর হাঙ্গামা বলা হয়। তিনি মারাঠাদের সাথে চুক্তি করে বাংলাকে মারাঠাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন।

 

নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা (১৭৫৬-১৭৫৭)

আলীবর্দী খানের কোন পুত্র সন্তান ছিলনা।ছোট মেয়ে আমেনার বিবাহ হয় জয়েরউদ্দিনের সাথে। তাঁদের সন্তান সিরাজ-উ-দ্দৌলাকে তিনি তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। সিরাজউদ্দৌলার প্রকৃত নাম মীর্জা মুহম্মদ আলী। তিলি ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজ-উ-দ্দৌলা বাংলার সিংহাসনে আরোহণ।এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। তিনি সিংহাসন লাভ করায় তার বড় খালা ঘষেটি বেগম এবং দরবারের প্রভাবশালীগণ নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ইংরেজগণ এ ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে অভিযান: ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতায় ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ অধিকার করেন। কলকাতা অধিকার করে সিরাজউদ্দৌলা নিজ মাতামোহের নামানুসারে এর নাম রাখেন আলীনগর।

অন্ধকূপ হত্যা কাহিনী: নবাবের কলকাতা অভিযান প্রাক্কালে হলওয়েসহ কতিপয় ইংরেজ কর্মচারী ফোর্ট উইলিয়ামে বন্দী ছিলেন। ঐতিহাসিক  হলওয়ের বর্ণনা মতে জানা যায় যে নবাব ১৪৬ জন ইংরেজ বন্দীর একটি ক্ষুদ্র দলকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধকরে রাখেন। এর মধ্যে ১২৩ জন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। হলওয়ের কর্তৃক প্রচারিত এই কাহিনী ‘অন্ধকূপ হত্যা’ নামে পরিচিত। তবে এই কাহিনীর কোন ঐতিহাসিক সত্যতা পাওয়া যায়না।

 

পলাশীর যুদ্ধ

২৩ জুন, ১৭৫৭ পলাশীর প্রান্তরে নবাবের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধ হয়। মীরমদন, মোহনলাল প্রমুখ দেশপ্রেমিক সৈনিকগণ প্রাণপণ যুদ্ধ করলেও নবাবের সেনাপতি মীরজাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, ইয়ারলতিফ, উমিচাঁদ এদের ন্যায় দেশদ্রোহীদের ষড়যন্ত্রে নবাব পরাজিত ও নিহত হন। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তিমিত হয়। সিরাজ-উ-দ্দৌলার হত্যাকারী মোহাম্মদী বেগ (মতান্তরে মীর জাফরের পুত্র মীরন)। পলাশীর প্রান্তর হল ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের উত্তরে ভাগীরথি নদীর তীরে ছোট একটি গ্রাম।

মীর কাসিম ও বক্সারের যুদ্ধ: মীর কাসিম ১৭৬০ সালে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন মীর জাফরের জামাতা। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাচেতা। তিনি অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং মুঘল সম্রাট শাহ আলমের সঙ্গে একত্রিত হয়ে ১৭৬৪ সালে বিহারের বক্সার নামক স্থানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বক্সারের যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কিন্তু তার সম্মিলিত বাহিনী মেজর মনরোর ইংরেজ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। যুদ্ধের পর মীর কাশিম আত্মগোপন করেন এবং ১৭৭৭ সালে মারা যান। শাহ আলম ইংরেজদের পক্ষে যোগদেন এবং সুজাউদ্দোলা রোহিলাখণ্ডে পালিয়ে যান।