মুসলিম শাসন

মুসলিম শাসন

উমাইয়া খলিফা বিন আব্দুল মালিকের শাসনকালে মুসলমানদের বিজরাভিজান শুরু হয়। তাঁর সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর সমগ্র উত্তর আফ্রিকা এবং তারিক স্পেন জয় করে। খলিফা ওয়ালিদের রাজত্বকালে  হাজ্জাজ বিন ইউসুফ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি ৭১২ সালে তাঁর জামাতা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে ব্রাহ্মণাবাদে সিন্ধু রাজা দাহির শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের অকালমৃত্যু কারণে উপমহাদেশে ইসলামের আর্বিভাব ঘটে।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্দু বিজয়ের প্রায় ৩০০ বছর পর গজনীর সুলতান মাহমুদ ১০০০ সাল থেকে ১০২৭ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে ১৭ বার অভিযান পরিচালনা করেন।

ভারতে মুসলিম শাসন

ময়েজউদ্দিন মোহাম্মদ বিন সামস ইতিহাসে শিহাবউদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরী নামে পরিচিত। কিছু ঐতিহাসিক তাকে ঘুরীদের পারসিক জাতি বলে অভিহিত করলেও ঐতিহাসিক লেনপুল তাদের আফগান জাতির বংশধর বলে অভিহিত করেন।গজনীতে ঘুর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে মুহাম্মদ ঘুরী উপমহাদেশে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন।

১১৯১ সালে মুহাম্মদ ঘুরী পৃথ্বিরাজ চৌহানের বিরুদ্ধে প্রথম তরাইনের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও আহত হয়ে স্বদেশে ফিরে যান। পরের বছর ১১৯২ সালে তিনি পুনরায় চৌহানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং জয়লাভ করেন। পৃথ্বিরাজ চৌহান এ যুদ্ধে নিহত হন এর ফলে উপমহাদেশে বা ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মদ ঘুরী উপমহাদেশের ভার তার সুযোগ্য সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেকের উপর দিয়ে গজনী ফিরে যান।

দিল্লি সালতানাত

দাস বংশ

কুতুবুদ্দিন আইবেক

কুতুবুদ্দিন আইবেক ছিলেন মুহাম্মদ ঘুরীর একজন ক্রীতদাস হিসেবে জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি মুহাম্মদ ঘুরীর সেনাপতি হন।তিনি মুহাম্মদ ঘুরীর অনুমতিক্রমে ভারত বিজয়ের পর দিল্লীতে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করেন। উপমহাদেশে স্থায়ীভাবে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন কুতুবুদ্দিন।এজন্য কুতুবুদ্দিন আইবেককে দাস বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিনি ছিলেন তুর্কিস্থানের অধিবাসী। এজন্য কুতুবুদ্দিন ও তার উত্তরাধিকারীদের শাসনামলকে প্রাথমিক যুগের তুর্কী শাসনও বলে চিহিৃত করা হয়ে থাকে।দানশীলতার জন্য তাকে ‘লাখবক্স’ বলা হতো। দিল্লির কুতুবমিনার নামক সুউচ্চ মিনারটি তাঁর আমলেই নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তিনি মিনারটির কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। দিল্লির বিখ্যাত সাধক কুতুবউদ্দিনের নির্মাণ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ারের কাকির নামানুসারে এর নাম রাখা হয় কুতুবমিনার।

সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুতমিশ

কুতুবুদ্দিন আইবেকের জামাতা ছিলেন ইলতুতমিশ।তিনি ছিলেন প্রাথমিক যুগে তুর্কী সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।তাকে দিল্লী সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ভারতে মুসলমান শাসকদের মধ্যে তিনি প্রথম মুদ্রা প্রচলন করেন। তিনি কুতুবমিনার নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন।

সুলতানা রাজিয়া

ইলতুতমিশের কন্যা সুলতানা রাজিয়া ১২৩৬ সালে দিল্লীর সিংহাসনের আরোহণ করেন।তিনি ছিলেন দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণকারী প্রথম মুসলমান নারী।

সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ

সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ অত্যন্ত ধর্মভীরু লোক ছিলেন।সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনের জন্য তিনি ফকির বাদশাহ নামে পরিচিত ছিলেন।তিনি কুরআন নকল ও টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বিদ্যোৎসাহী ও গুণীজনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ‘ভারতের তোতা পাখি’ নামে পরিচিত আমীর খররু বলবনের দরবার অলংকৃত করেন।

খলজী বংশ

আলাউদ্দিন খলজী

আলাউদ্দিন খলজী ১২৯৬ সালে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন।পর্যটক ইবনে বতুতা আলাউদ্দিন খলজীকে দিল্লীর শ্রেষ্ঠ সুলতান বলে অভিহিত করেছেন।আলাউদ্দিন খলজী জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য দ্রব্যের মূল্য নির্দিষ্ট হারে বেধে দেন।তিনি মূল্য ও বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রর্বতন করেন।আলাউদ্দিন খলজী শিল্পানুরাগী ছিলেন। বিখ্যাত আলাই দরওয়াজা তাঁরই কীর্তি।ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনী, কবি হোসেন দেহলবী, কবি আমির খসরু প্রমুখ গুণীজন তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।তিনি প্রথম মুসলমান শাসক হিসাবে দক্ষিন ভারত জয় করেন।তিনি ১৩০৬  তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুর  সালে সর্বপ্রথম দক্ষিণাত্যের দেবগিরির রাজা রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেবগিরির রাজা দিল্লীর আনুগত্য স্বীকার করেন।

তুঘলক বংশ

মুহাম্মদ বিন তুঘলক

মুহাম্মদ বিন তুঘলক অত্যন্ত প্রতিভাবান শাসক ছিলেন।তিনি ১৩২৫ সালে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন।রাজ্য শাসনের প্রত্যক্ষ অসুবিধা দূর করার জন্য ১৩২৬-২৭ সালে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী দিল্লী থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর করেন।কিন্তু নানাকারনে কর্মচারীদের দেবগিরি পছন্দ না হওয়ায় ও উত্তর ভারতে মঙ্গলদের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পুনরায় দিল্লীতে রাজধানী ফেরত আনেন। তিনি সোনা ও মুদ্রার পরিবর্তে প্রতীকী তামার মুদ্রা প্রচলন করে মুদ্রামান নির্ধারণ করেন। কিন্তু প্রতীক মুদ্রা জাল না হওয়ার জন্য যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা সে যুগে ছিলনা।এর ফলে ব্যাপকভাবে মুদ্রা জাল হতে থাকে। এ জন্য সুলতানকে এ পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হয়।

মাহমুদ শাহ

তুঘলক বংশের শেষ সুলতান ছিলেন মাহমুদ শাহ। বিখ্যাত তুর্কি বীর তৈমুর বেগ ছিলে মধ্য এশিয়ার সমরখন্দের অধিপতি। শৈশবে তার একটি পা খোড়া হয়ে যায় বলে তিনি তৈমুর লঙ নামে অভিহিত হন।সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি ১৩৯৮ সালে ভারত আক্রমণ করেন। তাকে বাধা দেওয়ার শক্তি মাহমুদ শাহের ছিলনা। তিনি বিনা বাধায় দিল্লিতে প্রবেশ করেন। প্রায় তিন মাস ধরে অবাধে হত্যা ও লুন্ঠন করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ নিয়ে স্বদেশে ফেরেন।তিনি একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করিয়ে যান যার নাম তুজুক ই তৈমুরী।

খান জাহান আলী

হযরত উলুঘ খান জাহান আলী ছিলেন বিশিষ্ট ধর্ম প্রচারক ও বাংলাদেশের বাগেরহাটের একজন স্থানীয় শাসক।তাঁর অন্যান্য নামের মধ্যে রয়েছে উলুঘ খান, খান-ই-আজম তিনি ১৩৬৯ সালে দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। খান জাহান আলী ১৩৮৯ সালে সেনাবাহিনীতে সেনাপতি পদে যোগদান করেন। তিনি রাজা গণেশকে পরাজিত করে বাংলার দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে ইসলামের পতাকা ওড়ান। তিনি বাগেরহাট জেলার বিখ্যাত ষাটগম্ভুজ মসজিদের নির্মাণ করেন।তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে (১৪৩৫-১৪৫৯ খিঃ) এটি নির্মাণ করেন।মসজিদের নাম ষাটগম্ভুজ হলেও এর মোট গম্ভুজ ৮১ টি।মসজিদের ভিতরে ষাটটি স্তম্ভ আছে। মসজিদের চার কোনায় চারটি পিলার রয়েছে। এটি বাংলাদেশে মধ্য যুগের সবচেয়ে বড় মসজিদ।১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো ষাটগম্ভুজ মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষনা করেন।

খানজাহানের প্রথম স্ত্রীর নাম সোনা বিবি। কথিত আছে সোনা বিবি ছিলেন খানজাহানের পির নুর-কুতুবুল আলমের একমাত্র কন্যা। খানজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী রূপা বিবি ওরফে বিবি বেগনি ধর্মান্তরিত মুসলমান ছিলেন। খানজাহান আলি তাঁর দুই স্ত্রীর নাম অনুসারে সোনা মসজিদ এবং বিবি বেগনি মসজিদ নামে মসজিদ নির্মাণ করেন।

লোদী বংশ

ইব্রাহীম লোদী

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ১৫২৬ সালে বাবরের কাছে দিল্লীর লোদী বংশের সর্বশেষ সম্রাট ইব্রাহীম লোদী পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দিল্লীর সালতানাতের পতন হয়।

মুঘল সাম্রাজ্য

জহিরদ্দিন মুহম্মদ বাবর ১৫২৬ সালে ইব্রাহীম লোদীকে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

পানিপথের যুদ্ধ

পানিপথ উত্তর-পশ্চিম ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের একটি শহর। এটি দিল্লি থেকে ৯০ কিমি. উত্তরে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত।এখানে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে পানিপথের যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

যুদ্ধ পানিপথের প্রথম যুদ্ধ পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ
প্রতিপক্ষ বাবর আকবরের সেনাপথি বৈরাম খান আহমদ শাহ আবদালি
ইব্রাহীম লোদী আফগান নেতা হিমু মারাঠা
সময়কাল ১২ এপ্রিল, ১৫২৬ ১৫৫৬ সাল ১৭৬১ সাল
ফলাফল ইব্রাহীম লোদী পরাজিত ও নিহত হন। আকবর দিল্লি অধিকার দিল্লি অধিকার করেন। হিমু পরাজিত ও নিহত হন।আকবর দিল্লি অধিকার দিল্লি অধিকার। মারাঠা শাসকদের পেশোয়া বলে।আহমদ শাহ আবদালি মারাঠাদিগকে পরাজিত করেন।

 

মসলিন কাপড়

মসলিন তুলার আশ থেকে প্রস্তুত করা একধরনের কাপড় বিশেষ। মসলিন ছিলো মুঘল সম্রাটদের বিলাসের বস্তু।

মুঘল সম্রাটদের বংশ তালিকা

জহির উদ্দিন বাবর

(মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা)

সম্রাট হুমায়ন

সম্রাট আকবর

সম্রাট জাহাঙ্গীর

সম্রাট শাহজাহান

সম্রাট আওরঙ্গজেব

সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ

(সর্বশেষ মুঘল সম্রাট)

 

জহির উদ্দিন বাবর

জিহির উদ্দিন মুহাম্মদ তার সাহসিকতা ও নির্ভীকতার জন্য ইতিহাসে ‘বাবর’ নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেছিলেন।বর্তমান রুশ-তুর্কিস্থানের অন্তর্গত ফারগানায় বাবরের জন্ম।তিনি পিতার দিক থেকে তৈমুর লঙ  এবং মাতার দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। বাবর মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ‘তুযক-ই-বাবর’ বা বাবুরের আত্মজীবনী নামক গ্রন্থে বাবর তাঁর জীবনের জয়পরাজয়ের ইতিহাস লিখেন। ১৫২৭ সালে তিনি বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন।বাবরি মসজিদ ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা নগরীতে অবস্থিত। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্রবাদী হিন্দুগোষ্ঠী ঐতিহাসিক এই মসজিদ ভেঙ্গে পেলে।বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় তদন্তের জন্য গঠিত কমিশনের নাম লিবারহ্যান কমিশন। এ কমিশনের বিজেপি নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদভানি, কালয়ান সিং সহ ৬৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

নাসির উদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ন 

বাবরের মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ন ১৫৩০ সালে দিল্লীর সিংহাসন লাভ করেন।তিনি ১৫৩৮ সালে বাংলায় প্রবেশ করেন এবং গৌড় অধিকার করেন।তিনি গৌড় নগরের অপরূপ সৌন্দর্য এবং জলবায়ু দেখে মুগ্ধ হন। তিনি গৌড়ের নাম পরিবর্তন করে রাখেন জান্নতাবাদ।তিনি বাংলায় ৮ মাস থেকে দিল্লীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।কিন্তু পথিমধ্যে বক্সারের নিকটবর্তী চৌসার নামক স্থানে শেরশোহ হুমায়নকে অর্তকিত আক্রমণ করেন।চৌসারের যুদ্ধে (১৫৩৯) পরাজিত হয়ে হুমায়ন কোনক্রমে প্রান নিয়ে দিল্লী পৌছাঁন। পরের বছর ১৫৪০ সালে শেরশাহর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন।কিন্তু কনৌজের নিকট বিলগ্রামের এ যুদ্ধে তিনি শোচনীয় ভাবে পরাজিত হন। বিজয়ী শেরশাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন।

শূর শাসন : শেরশাহ

১৫৩৯ সালে চৌসারের যুদ্ধে হুমায়নকে পরাজিত করে শেরখান ‘শেরশাহ উপাধি গ্রহণ করেন।তিনি নিজেকে বিহারের স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষনা করেন। তিনি হুমায়নকে পরাজিত করে দিল্লীর অধিকার নিয়ে উপমহাদেশে আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।শেরশাহ ‘সড়ক-ই-আজম’ নামে বাংলাদেশের সোনরগাঁও থেকে লাহোর পর্যন্ত ৪৮৩০ কি.মি র্দীঘ একটি মহাসড়ক নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ইংরেজরা এ সড়ক সংস্কার করে নাম দেন ‘গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড’।শেরশাহ কবুলিয়ত ও পাট্টার প্রচলন করেন। কৃষকগণ তাদের অধিকার ও দায়িত্ব বর্ণনা করে সরকারকে কবুলিয়ত নামে দলিল সম্পাদন করে দিত আর সরকারের পক্ষ থেকে জমির উপর জনগণের স্বত্ব স্বীকার করে পাট্টা দেওয়া হতো।শেরশাহ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ডাক ব্যবস্থার প্রচলন করেন। ডাক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য তিনি ঘোড়ার মাধ্যমে ডাক আনা নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।শেরশাহ মুদ্রা ব্যবস্থার  সংস্কার করেন। তিনি ‘দাম’ নামক রূপার মুদ্রার প্রচলন করেন।এখন বস্তুর মূল্যকে দাম বলা হয়।

হুমায়নের দ্বিতীয় অধ্যায়

পারস্যের সম্রাটের সাহায্যে হুমায়ন ১৫৫৫ সালের ২২ জুন সেরহিন্দের যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে শেরশাহকে পরাজিত করে তিনি আবার দিল্লীর অধিকার নেন। ১৫৫৬ সালে দিল্লীর অদূরে নিজের নির্মিত ‘দীন পানাহ’ দূর্গের পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে তিনি মারা যান।

সম্রাট জালাল উদ্দিন আকবর

১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মাত্র ১৩ বছর বয়সে আকবর দিল্লির সিংহাসনে বসেন। হুমায়নের মৃত্যুর পর বৈরাম খান আকবরের রাজ প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। এজন্য আকবর তাকে ভালোবেসে খান-ই-বাবা বলে ডাকতেন।হুমায়নের মৃত্যুর পর হিমু দিল্লির মুঘল শাসন কর্তাকে পরাজিত করে দিল্লী ও আগ্রা-র দখল নেন।১৫৫৬ সালে পানি পথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আকবর হিমুকে পরাজিত করে দিল্লীর অধিকার করেন।সম্রাট আকবরের সময়ই মুঘল সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তার লাভ করে। তিনি ১৫৭৬ সালে বাংলা জয় করেন। অমুসলিমদের উপর ধার্য সামরিক করকে জিজিয়া কর বলে। তিনি রাজপুত ও হিন্দুদের বন্ধুত্ব অর্জনের জন্য তীর্থ ও জিজিয়া কর রহিত করেন।১৫৮২ সালে তিনি সকল ধর্মের সার সংক্ষেপ ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামক নতুন একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রণয়ন করেন।

ভারতে ইসলামি শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে সকল কাজ করা হত। আকবর প্রচলিত চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌরপঞ্জিকায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিদ ওমর ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব দেন।ওমর ফতুল্লাহ শিরাজীর সুপারিশে সম্রাট আকবর ৯৯২ হিজরী (১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে) – এ বাংলা সৌর  বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তন করেন।তবে তিনি ২৯ বছর পূর্বে  সিংহাসনে আরোহণের দিন থেকে এ  পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন।এজন্য তিনি ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু করেন।

আকবর মনসবদারী প্রথা চালু করেন। অম্বরের রাজা ভর মল্লের কন্যা জোধাবাঈ-এর সাথে তার বিবাহ হয়। ভর মল্লের পুত্র রাজা ভগবন দাস আকবরের সভায় নবরত্নের একজন ছিলেন। ভগবন দাসের পুত্র রাজা মান সিংহ আকবরের বিশাল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। রাজা টোডর মল্ল ছিলেন আকবরের অর্থমন্ত্রী। আরেক রাজপুত, বীরবল, ছিলেন আকবরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও প্রিয়পাত্র। 

সম্রাটের রাজসভার সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবুল ফজল, ফৈজী, টোডরমল, বীরবল, মানসিংহ উল্লেখযোগ্য। রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল রাজস্ব ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। আকবরের সভাসদ আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরী’ নামক গ্রন্থে দেশবাচক বাংলা শব্দ ব্যবহার করেন।