রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জন্ম ও পরিচিতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালের ৭ই মে(বাংলা ১২৬৮ বঙ্গাব্দ,২৫শে বৈশাখ)কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।তার পিতামহ (দাদা) ছিলেন প্রিন্স দ্বারকান ঠাকুর এবং পিতামহী (দাদী)ছিলেন দিগম্বরী দেবী।রবীন্দ্রনাথের পিতার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতার নাম সারদা দেবী।তিনি তার পিতা-মাতার চতুর্দশ সন্তান ও অষ্টম ছেলে।তারা হচ্ছেন পিরালি ব্রাহ্মণ বংশের। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের আসল পদবি ‘কুশারী’।রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষেরা বাংলাদেশের বর্তমানে খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগে বাস করতেন।ভবতারিণী দেবীকে তিনি বিয়ে করেন ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর।তার শ্বশুর বাড়ি খুলনায়। ভবতারিণী দেবীর নাম পাল্টে রাখেন মৃণালিনী দেবী।তাদের ছিল দুই পুত্র ও তিন মেয়ে। তিনি  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ আগস্ট, ১৯৪১ সালে(বাংলা ২২ শ্রাবণ,১৩৪৮) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

শান্তিনিকেতন: ১৮৬৩ সালে রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুরে ‘শান্তিনিকেতন’ নামে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তি নিকেতনে ‘ব্রহ্মাচর্যাশ্রম’ নামক বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা করেন যা ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী কলেজ

(পরবর্তীতে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়) এ পরিনত হয়।

বঙ্গভঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে তিনি তীব্র বিরোধিতা করেন।হিন্দু-মুসলমান সম্প্রতীর জন্য তিনি রাখি উৎসব প্রচলন করেন।

নাইট উপাধি ত্যাগ: ১৯১৫ সালে ততৎকালীন ভারত সরকার তাকে স্যার বা নাইট উপাধি দেন।১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে তিনি ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেন।

উপাধি: ১৯১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৪০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট বা ডি লিট ডিগ্রি প্রদান করে।

১৯৩০ সালে জার্মানিতে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাথে তার সাক্ষাত হয়।সেখানে তিনি মানুষ, দর্শন ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেন।

 

বাংলাদেশ ও ঢাকা: ঢাকায় তিনি মোট দুইবার(১৮৯৮ ও ১৯২৬) আসেন। বাংলাদেশে তাঁর স্মৃতি বিজড়িত স্থানশাহজাদপুর(সিরাজগঞ্জ), শিলাইদহ(কুষ্টিয়া), পতিশ্বর(নওগাঁ)। সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কল্পনা, ক্ষনিকা এবং কথা ও কাহিনী কবির শিলাদহ পর্বের রচনা।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক।‘ভানুসিংহ ঠাকুর’ তাঁর ছদ্মনাম।তার মোট ৯টি ছদ্মনাম বা উপাধি আছে।তাকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি নানা নামে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁকে প্রথম বিশ্ব কবি নামে অভিষিক্ত করেন পন্ডিত ক্যাথলিক ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়।

জাতীয় সঙ্গীত: বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসির প্রথম ১০ লাইন। এই গানটি গীতবিতানের স্বরবিতান অংশভুক্ত।গানটির সুরকার তিনি নিজে যা স্বদেশ পর্যায়ের গান। গানটিতে বাউল গগন হরকরার সুরের প্রভাব পড়েছিল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে এর প্রথম চার পক্তির বাদ্যযন্ত্রে বাজানো হয়।

  • রবীন্দ্রনাথের ৯টি ছদ্মনা হলো- ভানুসিংহ ঠাকুর, অকপটচন্দ্র ভাস্কর, আন্নাকালী পাকড়াশী, দিকশূন্য ভট্টাচার্য, নবীন কিশোর শর্মণঃ, ষষ্ঠীচরণ দেবশর্মাঃ, বাণীবিনোদ বিদ্যাবিনোদ, শ্রীমতী কনিষ্ঠা, শ্রীমতী মধ্যমা।
  • হিন্দি ‘অচ্ছুৎ কন্যা’ চলচ্চিত্রের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
  • রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্রের একটি গানের রচনা, একটি গানের সুর দেওয়া ছাড়াও সার্বিক সঙ্গীত পরিচালনায় নজরুল ছিলেন।
  • রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন ১৯২৬ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি। বক্তৃতার শিরোনাম ছিলো-The meaning of Art.দ্বিতীয় বক্তৃতা দেন ১৩ই ফেব্রুয়ারি। বক্তৃতার শিরোনাম ছিলো-The Rule of the Giant.তিনি কার্জন হলে উভয় বক্তৃতা দেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে তিনি ছাত্রদের অনুরোধে ‘বাসন্তিকা’ কবিতাটি রচনা করেন।
  • রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ –বিবিধপ্রসঙ্গ।
  • তিনি মোট ১৩টি নাটকে অভিনয় করেন।
  • রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম সমাজের দায়িত্ব নেন ১৮৮৪।
  • শান্তি নিকেতনে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরুকরেন ১৯০১ সালে।একই বছর তিনি সেখানে ‘বহ্মচর্যাশ্রম’ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
  • বসন্ত গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন।
  • বিবিসির জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় (প্রথম বঙ্গবন্ধু)।
  • তার শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ সঞ্চয়িতা।
  • মৃত্যুর পর তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের ছড়া’ এবং ‘শেষলেখা’ প্রকাশিত হয়।
  • প্রায়শ্চিত নাটক ভেঙ্গে তিনি ‘পরিত্রাণ’ নাটক রচনা করেন।
  • তার চীনা নাম চু চে তান।
  • প্রথম গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

 

 

সাহিত্য জীবন

 

মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কবিতা রচনা শুরু করেন।

প্রথম কবিতা: তার প্রথম কবিতা ছিল হিন্দু মেলার উপহার। মাত্র ১৩ বছর বয়সে কবিতাটি ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ: কবির প্রথম জীবনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য কবিতা।কবিতাটির উপলব্ধি ছিল ভবিষৎ বিচিত্র ও বিপুল সম্ভাবনাময়।

এছাড়াও তার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কবিতা গুলো হল : সবুজের অভিযান (বলাকা), শাজাহান(বলাকা), নিরুদ্দেশ যাত্রা (সোনার তনী), হিংটিংছট (সোনার তনী), ১৪০০ সালে (চিত্রা), উবর্শী(চিত্রা), ন্যায়দন্ড (নৈবেদ্য), দুই বিঘা জমি (কথা ও কাহিনী), আষাঢ়, ছবি, আত্মত্রাণ, আমাদের ছোট নদী, প্রশ্ন, জীবনের জলছবি, বিদায় অভিশাপ, ঐকতান।

‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ সনেট জাতীয় রচনা তার।রবীন্দ্রনাথ ছিলেন টি.এস.এলিয়টের কবিতার প্রথম বাংলা অনুবাদক।

কাব্যগ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথের মোট কাব্যগ্রন্থ ৫৬টি। তার প্রধান কাব্যগ্রন্থসমূহ হলো: কবি-কাহিনী, বনফুল, গীতাঞ্জলি, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি, পূরবী, খেয়া, মানসী, সঞ্চয়িতা, চিত্রা, সোনার তরী, কথা ও কাহিনী, বলাকা, মহুয়া, শ্যামলী, আরগ্য, লেখন, শেষ সপ্তক, চৈত্রালী, গীতালী, গীতবিতান, সন্ধাসংগীত, প্রভাতসংগীত, বিচিত্রিতা, সেঁজুতি, উৎসর্গ, ছড়ার ছবি, নবজাতক, সানাই, গল্পসল্প, পরিশেষ, জন্মদিনে, পুনশ্চ, ক্ষনিকা, নৈবেদ্য, স্ফুলিঙ্গ, কড়ি ও কোমল, শেষলেখা।

 

কবি-কাহিনী: রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ বা কাব্যগ্রন্থ কবি-কাহিনী।‘ভারতী’ পত্রিকায় পৌষ-চৈত্র্য, ১২৮৪ বঙ্গাব্দ (১৮৭৮ সালে) সংখ্যায় এর কবিতাগুলো ছাপানো হয়।এটি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত।

বনফুল(১৮৮০): গ্রন্থ হিসেবে ‘বনফুল’ রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ বা কাব্যগ্রন্থ।তবে জ্ঞানাঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব নামক দুটি পত্রিকায় ‘বনফুল’ গ্রন্থের কবিতা ১৮৭৬ সালেই প্রকাশ পায়। তাই অনেকে ‘বনফুল’ কে রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বলে থাকে।

গীতাঞ্জলি: ‘গীতাঞ্জলি’ রবীন্দ্রনাথের ১৫৭টি গানের সংকলন। এটি তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ।গানগুলি ১৯০৮ ও ১৯০৯ সালে রচিত হয় এবং ১৯১০ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।ভাবধারার দিকথেকে কবিতাগুলোকে ৫ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বাংলা গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজী অনুবাদগ্রন্থ – Song Offerings – ইংরেজি ভাষায় গদ্যে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম সংকলনগ্রন্থ।১৯১২ সালের শেষ দিকে লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটি কর্তৃক প্রথম ‘গীতাঞ্জলি’/ Song Offerings প্রকাশিত হয়।‘The Song Offerings’ গ্রন্থটিরআন্তরিক ও প্রশস্থিপূর্ণ ভূমিকায় লেখেন W.B.Yeates।রবীন্দ্রনাথ ‘গীতাঞ্জলি’/ Song Offerings গ্রন্থটি তাঁকেই উৎসর্গ করেন।১০ নভেম্বর, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথকে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।তিনি নোবেল বিজয়ী প্রথম ভারতীয় তথা এশীয় এবং সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী প্রথম অ-ইউরোপীয় ব্যক্তি।২০০৪ সালের ২৪ মার্চ দিবাগত রাতে ‘শান্তি নিকেতন’ থেকে তার নোবেল পুরস্কার চুরি হয়ে যায়।

‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ব্রজবুলি ভাষায় রচনা করেন।

পূরবী: পূরবী কাব্যগ্রন্থ রবীন্দ্রনাথ আর্জেন্টিনার কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে উৎসর্গ করেন।এখানে কবিগুরু তাকে বিজয়া নাম দেন।

 

খেয়া: এই কাব্য গ্রন্থটি জগদীশচন্দ্র বসুকে রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করেন।

 

পুনশ্চ: কাব্যটি থেকে গদ্যরীতিতে কবিতা লেখা শুরু করেন।এটি তাঁর গদ্যছন্দে রচিত প্রথম ও সার্থক কাব্যগ্রন্থ। এর উল্লেখযোগ্য কবিতা- ছেলেটা, শেষ চিঠি, ক্যামেলিয়া, সাধারণ মেয়ে, খ্যাতি।

 

সোনার তরী: মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত এটি। কাব্যগ্রন্থটি বাংলাদেশের শিলাদহে রচনা করন।

বলাকা: কাব্যগ্রন্থটিতে গতিতত্ত্বের প্রকাশ ঘটেছে।

 

নৈবেদ্য: স্ত্রীর মৃত্যুকে উপলক্ষ্য করে এটি রচিত হয়েছে।

 

মানসী: ‘মানসী’ রবীন্দ্রনাথের কাব্যকলার পূণপ্রতিষ্ঠামূলক কাব্যগ্রন্থ।তাই কবি বুদ্ধদেব ‘মানসী’ কাব্য গ্রন্থকে রবীন্দ্র-কাব্যের অনুবিশ্ব বলেছেন। উল্লেখযোগ্য কবিতা: নিষ্পল কামনা, দুরন্ত আশা, ভুলভাঙ্গা, কুহুধ্বনি, সুরদাসের প্রার্থনা, মেঘদূত, অহল্যার প্রতি, আত্মসমর্পণ ইত্যাদি।

 

স্ফুলিঙ্গ: ‘স্ফুলিঙ্গ’ ছোট ছোট কবিতার সংকলন।এর অনেক কবিতাই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির স্বাক্ষর সংগ্রহের খাতা বা ডায়েরি থেকে সংগৃহীত।

শেষলেখা (১৯৪১): এটি রবীন্দ্রনাথের শেষ কাব্যগ্রন্থ বা শেষগ্রন্থ।এটি তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়।তিনি এর নামকরণ করে যেতে পারেননি।

 

উপন্যাস

রবীন্দ্রনাথের মোট উপন্যাসের সংখ্যা ১৩টি। এগুলো হলো: করুণা, বৌ ঠাকুরানীর হাট, রাজর্ষি, চোখের বালি, গোরা, যোগাযোগ, চতুরঙ্গ, ঘরে-বাইরে, চার অধ্যায়, মালঞ্চ, দুইবোন,প্রজাপতির নির্বন্ধ, নৌকাডুবি।

 

বৌঠাকুরানীর হাট(১৮৮৩): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম উপন্যাস বৌঠাকুরানীর হাট।এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস।

রাজর্ষি: রাজর্ষি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহাসিক উপন্যাস।

শেষের কবিতা (১৯২৯): শেষের কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি রোমান্টিক উপন্যাস।এটি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ১৯২৮ সালে।এই উপন্যাসে ভাষাবিদ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নাম পাওয়া যায়।এর প্রধান চরিত্র গুলো হল – অমিত, লাবন্য, শোভনলাল।

 

গোরা (১৯১০):‘গোরা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৃহত্তম এবং অনেকের মতে সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস।‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ১৯০৮ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য চরিত্র – গোরা, পরেশবাবু, সুচরিতা, পানুবাবু, ললিতা, বিনয়, বরদাসুন্দরী, কৃষ্ণদয়াল, আনন্দময়ী প্রমুখ।

ঘরে বাইরে(১৯১৬): এটি স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত উপন্যাস। রবিন্দ্রনাথের চলিত ভাষায় ‍লিখিত প্রথম উপন্যাস ‘ঘরে বাইরে’।বৃটিশ ভারতের রাজনীতি এর মূল উপজীব্য। উপন্যাসটি ১৯১৫ সালে ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ঘরে বাইরে উপন্যাসটির সাথে পাশ্চাত্য ঔপন্যাসিক স্টিভেনসনের ‘প্রিন্স অটো’ উপন্যাসের ভাবসাদ্রশ্য আছে। প্রধান চরিত্র: বিমলা, নিখিল, সন্দীপ।

 

চার অধ্যায়: চার অধ্যায়(১৯৩৪) একটি রাজনৈতিক উপন্যাস।অসহযোগ আন্দোলনের পর বাংলায় নতুন করে যে হিংসাত্মক বিপ্লব প্রচেষ্টা দেখা দিয়েছিল ‘চার অধ্যায়’ তাঁর উপজীব্য। প্রধান চরিত্র: অতীন, এলা, ইন্দ্রনাথ।

 

চোখের বালি: চোখের বালি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। এর প্রধান চরিত্রগুলো হলো-বিহারী, মহেন্দ্র, বিনোদিনী।

 

নৌকাডুবি (১৯০৬):নৌকাডুবি একটি সামাজিক উপন্যাস।এই উপন্যাসটি বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।প্রধান চরিত্র: রমেশ, হেমনলিনী, কমলা, অন্নদাবাবু, নলিনাক্ষ, শৈলজ, উমেশ।

দুইবোন (১৯৩৩): এটিও একটি সামাজিক ছোট উপন্যাস।১৯৩২-৩৩ সালে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রধান চরিত্র: শর্মিলা, উর্মিলা, শশাঙ্ক।

যোগাযোগ:‘যোগাযোগ’ উপন্যাসটি ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় তিন পুরুষ নামে ধারাবাহিকভাবে ১৯২৭ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে।এটি একটি সামাজিক উপন্যাস।প্রধান চরিত্র: মধুসূদন, কুমুদিনী।

মালঞ্চ: এই উপন্যাসটি এক মৃত্যু পথযাত্রী নারী ও তার স্বামীর কাহিনী নিয়ে। এটি একটি ছোট বিয়োগান্তক উপন্যাস ।এটি‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রধান চরিত্র: নীরজা, আদিত্য, সরলা, রমেন।

করুনা: এটি তাঁর অসমাপ্ত উপন্যাস। প্রধান চরিত্র-মহেন্দ্র, মোহিনী, রজনী।

চতুরঙ্গ: চতুরঙ্গ রীন্দ্রনাথের ছোট গল্পধর্মী উপন্যাস। প্রধান চরিত্র- দামিনী, লীলানন্দ, শচীন, শ্রীবিলাস।

রাজর্ষি উপন্যাস বের হয় ‘বালক’ পত্রিকায়।

** নষ্টনীড় রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসধর্মী ছোট গল্প।

 

নাটক

রবীন্দ্রনাথের নাটক সংখ্যা ৩৮টি। রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হল- রুদ্রচন্ড(১৮৮১), বাল্মীকি প্রতিভা(১৮৮১), বির্সজন(১৮৯১), বসন্ত(গীতিনাট্য,১৯২৩), কালের যাত্রা, তাসের দেশ(১৯৩৩), রাজা(১৯১০), ডাকঘর(১৯১২), অচলায়তন(১৯১২), চিরকুমার সভা(১৯২৬), রক্তকরবী(১৯২৬), বৈকুন্ঠের খাতা, শারদোৎসব, প্রায়শ্চিত্ত,মুক্তধারা, শ্যামা(নৃত্যনাট্য), চিত্রাঙ্গদা(নৃত্যনাট্য), নটীর পূজা, রাজা ও রানী, রাজা, তাপসী, চন্ডালিকা, মুক্তধারা, মালিনী।

রুদ্রচন্ড : এটি তাঁর প্রকাশিত প্রথম নাটক।তবে অনেকের মতে ‘রুদ্রচন্ড’ আসলে নাটক নয়, এতে সামান্য নাটকীয়তা আছে মাত্র।

বাল্মীকি প্রতিভা: অনেকের মতে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত প্রথম নাটক।

বসন্ত: ‘বসন্ত’ একটি গীতিনাট্য যাতে যৌবনের প্রতীক ঋতুরাজ বসন্তের জয়গান গাওয়া হয়েছে।রবীন্দ্রনাথ এই নাটকটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন।

কালের যাত্রা: এই নাটকটি তিনি শরৎচন্দ্রকে উৎসর্গ করেন।

বির্সজন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মঞ্চসফল এবং জনপ্রিয় নাটকগুলোর অন্যতম বির্সজন।অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত এই কাব্যনাট্যে গোমতী নদীর কথা উল্লেখ আছে। এই নাটকে রবীন্দ্রনাথ রঘুপতি ও জয়সিংহের ভূমিকায় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন।মূলচরিত্র গুলো হল- জয়সিংহ, রঘুপতি, অর্পণা।

তাসের দেশ: ‘তাসের দেশ’ রূপক নাটক।রবীন্দ্রনাথের নিজেরই ‘এক আষাঢ়ে গল্প’ নামক গল্পের কাহিনি এই নাটকের উপজীব্য। এই নাটকটি তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে উৎসর্গ করেন।

রক্তকরবী: ‘রক্তকরবী’ তাঁর একটি সাংকেতিক নাটক।এটি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

বৈকুন্ঠের খাতা: এটি তাঁর জনপ্রিয় কৌতুক নাটক।

মুক্তধারা: মুক্তধারা নাটকের প্রথম নাম ছিল ‘মন’।

অরূপরতন: অরূপরতন ‘রাজা’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

ডাকঘর: সাংকেতি নাটক।এর প্রধান চরিত্র অমল।

প্রহসন

চিরকুমার সভা, শেষরক্ষা।

 

 

ছোটগল্প

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোট গল্পকার।তাই তাকে ছোটগল্পের জনক বলা হয়।তিনি প্রায় ১১৯টি ছোটগল্প লিখেন। ছোটগল্প সর্ম্পকে তিনি বলেন,“ছোট প্রাণ ছোট ব্যাথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা, নিতান্তই সহজ সরল”। তাঁর প্রধান গল্পগুলো হল- ভিখারিণী, দেনা-পাওনা, শেষকথা, প্রায়শ্চিত্ত, মধ্যবর্তিনী, সমাপ্তি, নষ্টনীড়, একরাত্রি, মাল্যদান, ল্যাবরেটরি, পাত্র ও পাত্রী, মহামায়া, স্ত্রীর পত্র, দুরাশা, ছুটি, হৈমন্তী, পোস্টমাস্টার, মাস্টারমশাই, কাবুলিওয়ালা, ব্যবধান, পণরক্ষা, দিদি, কর্মফল, মেঘ ও রৌদ্র, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, শাস্তিগুপ্তধন, ক্ষুদিত পাষাণ, মনিহার, নিশীথে, জীবিত ও মৃত।

ভিখারিণী: ভিখারিণী রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত প্রথম ছোটগল্প।

দেনা-পাওনা: বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্প।

সমাপ্তি: প্রধান চরিত্র- মৃন্ময়ী।

নষ্টনীড়: প্রধান চরিত্র- চারু, অমল।

একরাত্রি: প্রধান চরিত্র-সুরবালা(নায়িকা)

ছুটি: প্রধান চরিত্র-ফটিক।

পোস্টমাস্টার: প্রধান চরিত্র-রতন।

হৈমন্তী: প্রধান চরিত্র-হৈমন্তী, অপু, গৌরীশঙ্কর। এই গল্পে যৌতুক প্রথা প্রাধান্য পেয়েছে।

কাবুলিওয়ালা: প্রধান চরিত্র-রহমত ও খুকী। এই গল্পে মুসলমান চরিত্র আছে।

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন: প্রধান চরিত্র-রাইচরণ।

শাস্তি: প্রধান চরিত্র-দুখিরাম রুই, ছিদাম রুই, চন্দরা এবং রাধা।

জীবিত ও মৃত: প্রধান চরিত্র-কাদম্বিনী।

*রবীন্দ্রনাথের রচিত চারটি অতিপ্রাকৃত রসের ছোটগল্প: ক্ষুদিত পাষাণ, মনিহার, নিশীথে ও কঙ্কাল।

* রবীন্দ্রনাথের রচিত চারটি সমাজসম্স্যামূলক গল্প: দেনা-পাওনা, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ ও অনধিকার প্রবেশ।

 

গল্পগ্রন্থ: রবীন্দ্রনাথের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ছোটগল্প’।এছাড়ার অন্য গল্পগ্রন্থ গুলো হল কথা-চতুষ্ঠয়, বিচিত্রগল্প, তিনসঙ্গী, সে, গল্পসপ্তক, গল্পদশক, গল্প চারিটি, গল্পগুচ্ছ, পয়লা নম্বর, গল্পসল্প, তিনসঙ্গী, কর্মফল।

 

প্রবন্ধ

ভ্রমণকাহিনী: য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র, জাপান যাত্রী, জাভা যাত্রীর পত্র, রাশিয়ার পত্র।

ভাষাতত্ত্বমূলক:শব্দতত্ত্ব (ধ্বনিবিজ্ঞানের উপর লেখা), বাংলা ভাষার পরিচয়।

আত্মজীবনী: জীবনস্মৃতি (১৯১২), আমার ছেলেবেলা।

চিঠিপত্র: ছিন্নপত্র।একটি আত্মকথনমূলক পত্রসংকলন। অধিকাংশ পত্র ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে (প্রমথ চৌধুরীর স্ত্রী)উদ্দেশ্য করে লেখা।

এছাড়াও অন্যান্য পত্র – চিঠিপত্র(১-৭), ভানুসিংহের পত্রাবলী, সুর ও সংগীত, ছিন্নপত্রাবলী।

বিজ্ঞান বিষয়ক: বিশ্বপরিচয়।

রাজনৈতিক: সভ্যতার সংকট, কালান্তর, স্বদেশ, বাজে কথা।

“মানুষে উপর বিশ্বাস হারানো পাপ”- উক্তিটি করেছেন সভ্যতার সংকট প্রবন্ধে।

রম্য: পঞ্চভূত।

অন্যান্য: বিচিত্রপ্রবন্ধ, সাহিত্য, মানুষের র্ধম, কালান্তর।

রবীন্দ্রনাথ সম্পাতিদ পত্রিকা: সাধনা, ভারতী, বঙ্গদর্শন, তত্ত্ববোধনী।

 

রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত পক্তিসমূহ:

  • বুকের রক্ত দিয়া আমাকে যে একদিন দ্বিতীয় সীতা বির্সজনের কাহিনী লিখতে হইবে সে কথা কে জানিত।(হৈমন্তি)
  • যাহা দিলাম তাহা উজাড় করিয়াই দিলাম।এখন ফিরিয়া তাকাইতে গেলে দুঃখ পাইতে হইবে।(হৈমন্তি)
  • এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী, ইহার রহস্যের কি অন্ত আছে? (হৈমন্তি)
  • শিশুরাজ্যে এই মেয়েটি ছোটখাটো বর্গির উপদ্রব বলিলেই হয়।(সমাপ্তি)
  • কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই।(জীবিত ও মৃত)
  • মানুষ যা চায় ভুল করে চায়, যা পায় তা চায়না।
  • মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। (সভ্যতার সংকট)
  • আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।
  • ওরে নবীন, ওরা আমার কাঁচা,

ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ

আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। (সবুজের অভিযান)

  • মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে

মানবের মাঝে আমি বাচিঁবারে চাই।(প্রাণ)