সমাস

সমাস

সমাস গঠনের অন্যতম উপায় হলো সমাস । সমাস মানে সংক্ষেপ, মিলন, একাধিক পদের একপদীকরণ। অর্থাৎ পরস্পর অর্থসঙ্গতি ও সমন্ধ বিশিষ্ট একাধিক পদের এক সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় শব্দ গঠনের প্রক্রিয়াকে সমাস বলে। সমাসের রীতি সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে।

সমাসের বৈশিষ্ট্য:
১) সমাসের পদের সঙ্গে পদের মিলন ঘটে ও পদের বিভক্তি লোপ পায়।
২) সমাস দ্বারা দুই বা ততোধিক পদের সমন্বয়ে নতুন অর্থবোধক পদ সৃষ্টি হয়।
৩) বাক্যে শব্দের ব্যবহার সংক্ষেপ করার জন্য সমাসের সৃষ্টি।

সমাসের প্রতীতি

সমাসের প্রতীতি ৫টি।

এগুলো-
১) সমাসের প্রক্রিয়ায় সমাসবন্ধ বা সমাস নিষ্পন্ন পদটির নাম সমস্ত পদ।
২) সমস্ত পদকে ভেঙ্গে যে বাক্যাংশ করা হয়, তার নাম সমাসবাক্য/ব্যাসবাক্য/বিগ্রহবাক্য।
৩) সমস্ত পদ বা সমাসবন্ধ পদটির অর্ন্তগত পদগুলোকে সমস্যমান পদ বলে।
৪) সমাসযুক্ত পদের প্রথম অংশকে বলা হয় পূর্বপদ।
৫) সমাসযুক্ত পদেও প্রথম অংশকে বলা হয় উত্তরপদ বা পূর্বপদ।

উদাহরণঃ
সিংহ চিহ্নিত আসন =সিংহাসন
সমস্তপদ : সিংহাসন
ব্যাসবাক্য : সিংহ চিহ্নিত আসন
সমাস্যমান পদ : সিংহ
পরপদ বা উত্তরপদ : আসন

শ্রেণী বিভাগঃ

সমাস প্রধানত ৬ প্রকার
১) দ্বন্দ্ব
২) কর্মধারয়
৩) তৎপুরুষ
৪) বহুব্রীহি
৫) দ্বিগু
৬) অব্যয়ীভাব।
অপ্রধান সমাস : প্রাদি, নিত্য, অলুক ইত্যাদি।

দ্বন্দ্ব সমাস

যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। এ সমাসে পূর্বপদ ও পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায় এবং পূর্বপদ ও পরপদ দুটি ‘এবং’ ‘ও’ ‘আর’ -এ তিনটি সংযোজক অব্যয় দ্বারা যুক্ত হয়।

উদাহরণ :
তাল ও তমাল = তাল-তমাল
দোয়াত ও কলম = দোয়াত-কলম
মাতা ও পিতা = মাতা-পিতা
জমা ও খরচ = জমা-খরচ
ভাই ও বোন = ভাই-বোন
শিক্ষক ও ছাত্র = শিক্ষক- ছাত্র
জ্যায়া ও পতি = দম্পতি
যাকে ও তাকে = যাকে- তাকে
অহি ও নকুল = অহি- নকুল
দা ও কুমড়া = দা-কুমড়া
আমি, তুমি ও সে = আমরা
হাটে ও বাজারে =হাটে-বাজারে
চন্দ্র ও সূর্য = চন্দ্র- সূর্য
পথে ও প্রান্তরে = পথে- প্রান্তরে

দ্বন্দ্ব সমাসের গঠন প্রক্রিয়া

 

 

গঠন-বৈশিষ্ট্য গঠন প্রক্রিয়া

(ব্যাস বাক্য)

গঠিত শব্দ(সমস্তপদ) উদাহরন
মিলনার্থক শব্দযোগে মা ও বাপ মা-বাপ ভাই-বোন, মাসি-পিসি, চা-বিস্কুট, ছেলে-মেয়ে, মশা-মাছি, জি¦ন-পরি।
বিরোধার্থক শব্দযোগে স্বর্গ ও নরক স্বর্গ-নরক দা-কুমড়া, অহি-নকুল, ভাল-মন্দ, আদা-জল, হেস্ত-নেস্ত, স্বর্গ-নরক।
বিপরীতার্থক শব্দযোগে লাভ ও লোকসান লাভ – লোকসান আয়-ব্যয়, জমা-খরচ, ছোট-বড়, ছেলে-বুড়ো।
সংখ্যা বাচক শব্দযোগে নয় ও ছয় নয় – ছয় সাত-পাঁচ, উনিশ-বিশ।
সমার্থক শব্দযোগে হাট ও বাজার হাট – বাজার ঘর-দুয়ার, কল-কারখানা, মোল্লা-মৌলভি, খাতা- পত্র, লজ্জা-শরম, কার্জ-কর্ম, জন-মানব।
অঙ্গবাচক শব্দযোগে হাত ও পা হাত – পা নাক-কান, বুক-পিঠ, মাথা-মুন্ডু, নাক-মুখ
প্রায় সমার্থক ও সহচর শব্দযোগে দয়া ও মায়া দয়া – মায়া কাপড়-চোপড়, পোকা-মাকড়, ধূতি-চাদর।
দুটো সর্বনাম যোগে তুমি আর আমি তুমি-আমি যা-তা, যে-সে, যথা-তথা।
দুটি ক্রিয়া যোগে দেখা ও শোনা দেখা-শোনা যাওয়া-আসা, চলা-ফেরা, দেওয়া-থোওয়া
দুটি ক্রিয়া বিশেষন যোগে ধীরে ও সুস্থে ধীরে-সুস্থে আগে-পাচে, আকারে-ইঙ্গিতে
দুটি বিশেষন যোগে ভালো ও মন্দ ভালো-মন্দ কম-বেশি, আসল-নকল, বাকি-বকেয়া।
বহুপদী দ্বন্দ্ব(তিন বা অধিক পদের সমন্বয় এ সমাস গঠিত হয়) আগ-পাছ-তলা, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল
একশেষ দ্বন্দ্ব সে-তুমি-আমি   আমরা
সম্বন্ধবাচক দ্বন্দ্ব জায়া ও পতি   দম্পতি

 

অলুক দ্বন্দ্ব

যে দ্বন্দ্ব সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ হয়না, তাকে অলুক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন : দুধে-ভাতে, জলে-স্থলে।
তিন বা বুহু পদে দ্বন্দ্ব সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: সাহেব-বিবি-গোলাম, হাত-পা-নাক-মুখ-চোখ ইত্যাদি।
কর্মধারায় সমাস
যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণ ভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্য ভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধান রূপে প্রতীয়মান হয়, তাকে কর্মধারায় সমাস বলে। যেমন-সুন্দর যে পুরুষ=সুপুরুষ, নীল যে পদ্ম= নীলপদ্ম, শান্ত অথচ শিষ্ট=শান্তশিষ্ট। সুন্দরী যে লতা=সুন্দরলতা কর্মধারয় সমাসে সাধারনত যে, যিনি, যেটি ইত্যাদি শব্দ ব্যাসবাক্যে ব্যবহৃত হয়। যথা:
নীল যে আকাশ = নীলাআকাশ
নীল যে অম্বর = নীলাম্বর (নীলবর্ন বস্ত্র)
যিনি জজ তিনিই সাহেব = জজসাহেব
সুন্দরী যে লতা = সুন্দরলতা
মহতী যে কীর্তি = মহার্কীতি
কাঁচা অথচ মিটা = কাঁচামিটা
যে চালাক সেই চতুর = চালাক চতুর
কু যে অর্থ = কদর্থ
আগে ধোয়া পরে মোছা = ধোয়া মোছা
মহান যে নবী = মহানবী।
মহান যে রাজা = মহারাজ।
কু যে আচার = কদাচার।
শান্ত অথচ শিষ্ট = শান্ত শিষ্ট।

প্রকারভেদ :

র্কমধারয় সমাস অনেক প্রকারের হয়।
১) সাধারন র্কমধারয়: যে সমাসে বিশেষণ এর সঙ্গে বিশেষ্য বা বিশেষণ অথবা বিশেষ্য সঙ্গে বিশেষ্য বা বিশেষণ হয় তাকে সাধারন র্কমধারয় সমাস বলে। উদাহরণ : কাঁচা যে কলা = কাঁচকলা, সিন্ধ যে আলু = আলুসিন্ধ, গন্য যিনি মান্যও তিনি = গন্যমান্য, মহৎ যে জন – মহাজন , নীল যে উৎপল = নীলোৎপল, সৎ যে লোক = সৎলোক, রক্ত যে কমল = রক্তকমল, চলৎ যে চিত্র = চলচ্চিত্র, নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম, মহতী যে কীর্তি = মহাকীর্তি, মহান যে নবী = মহানবী, কু যে অর্থ = কুদর্থ, মহান যে রাজা = মহারাজা, অধম যে নব = নরাধম, সিদ্ধ যে আলু = আলু সিদ্ধ, মহান যে বীর = মহাবীর, সু যে খবর = সুখবর, শে^ত যে বস্ত্র = শে^তবস্ত্র, মন্দ যে ভাগ্য = মন্দভাগ্য, কু যে আচার = কদাচার
২) মধ্যপদলোপী কর্মধারয়: যে কর্মধারায় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যপদের লোপ পায় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারায় সমাস বলে। উদাহরণ: অষ্ট অধিক দশ = অষ্টাদশ, সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন, সাহিত্য বিষয়ক সভা = সাহিত্যসভা, স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ = স্মৃতিসৌধ, রান্না করার ঘর = রান্নাঘর। জ্যোৎস্না শোভিত রাত = জ্যোৎস্নারাত, পল(মাংস) মিশ্রিত অন্ন, প্রীতি উপলক্ষে ভোজ = প্রীতিভোজ।
বৌ পরিবেশন করা ভাত = বৌভাত, অধম যে নর = নরাধম, সংবাদ যুক্ত পত্র = সংবাদপত্র, আত্নলিখিত জীবনী = আত্নজীবনী, এক অধিক বিংশতি = একবিংশতি, আয়ের উপর কর = আয়কর, ঘওে আশ্রিত জামাই = ঘরজামাই, গীতিপূর্ণ যে নাট্য = গীতিনাট্য, ঘোষনা সম্বলিত যে পত্র = ঘোষনাপত্র, মৌ সঞ্চয়কারী মাছি = মৌমাছি।

উপমান-উপমেয় কর্মধারয়

উপমান অর্থ তুলনীয় বস্তু। যার সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর তুলনা করা হয় তাকে উপমান, যাকে তুলনা করা হয় তাকে উপমেয় বলে। পত্যক্ষ কোনো বস্তুর সাথে পরোক্ষ কোনো বস্তুর তুলনা করলে পত্যক্ষ বস্তুটিকে বলা হয় বলা হয় উপমেয় আর পরোক্ষ বস্তুটিকে বলা হয় উপমান।

উদাহরণ:
তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র (এখানে উপমান তুষার, সাধারন গুণ শুভ্র)
অরুণের ন্যায় রাঙা = অরুনরাঙা।
ঘণের ন্যায় ধার্মিক = ঘনশ্যাম।
বকের ন্যায় ধার্মিক = বকধার্মিক।
শশকের ন্যায় ব্যস্ত = শশব্যস্ত।
চাঁদের ন্যায় মুখ = চাঁদমুখ।
বিষ সদৃশ্য বৃক্ষ = বিষবৃক্ষ।
মিশের ন্যায় কালো = মিশকালো।
কুন্দেও মতো শুভ্র = কুন্দশুভ্র।
গো-ও ন্যায় বেচারী = গোবেচারী।
তুষারের ন্যায় ধবল = তুষারধবল।
প্রস্তরের ন্যায় কঠিন = প্রস্তরকঠিন।
অগ্নির ন্যায় শর্মা = অগ্নিশর্মা।
কুসুমের ন্যায় কোমল = কুসুমকোমল।
গজের ন্যায় মূর্খ = গজমূর্খ।
হিমের ন্যায় শীতল = হিমশীতল।

উপমিত কর্মধারয়

সাধারণ গুনের উল্লেখ না করে উপমেয় পদের সাথে উপমানের যে সমাস হয়, তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। এক্ষেত্রে সাধারণ গুনের বা র্ধমের উল্লেখ থাকেনা, তা অনুমান করে নেয়া হয়।
উদাহরণ:
মুখ চন্দ্রের ন্যায় = চন্দ্রমুখ।
পুরুষ সিংহের ন্যায় = সিংহপুরুষ।
বাবু ফুলের ন্যায় = ফুলবাবু।
চরণ ফুলের ন্যায় = চরণকমল।
অধর পল্লবের ন্যায় = অধরপল্লব।
কথা অমৃতের ন্যায় = কথামৃত।
কর পল্লবের ন্যায় = করপল্লব।
বীর সিংহের ন্যায় = বীরসিংহ।
বাহু লতার ন্যায় = বাহুলতা।
কুমারী ফুলের ন্যায় = ফুলকুমারি।
নর সিংহের ন্যায় = নরসিংহ

রূপক কর্মধারায় সমাস

উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভিন্নতা কল্পনা করা হলে রূপক কর্মধারায় সমাস হয়। এ সমাসে উপমেয় পদ পূর্বে বসে এবং উপমান পদ পরে বসে এবং সমস্যমান পদে ‘রূপ’ অথবা ‘ই’ যোগ করে ব্যাসবাক্য গঠন করা হয়।

উদাহরনঃ
ক্রোধ রূপ অনল = ক্রোধানল
বিষাদ রূপ সিন্ধু= বিষাদসিন্ধু
মন রূপ মাঝি = মনমাঝি
সংসার রূপ সাগর = সংসারসাগর
মোহ রূপ নিদ্রা = মোহনিদ্রা
শোক রূপ অনল = শোকানল
হৃদয় রূপ মন্দির = হৃদয়মন্দির
ভব রূপ নদী = ভবনদী
আনন্দ রূপ মন্দির = আনন্দমন্দির
পরান রূপ পাখি = পরানপাখি
জীবন রূপ তরী = জীবনতরী
জ্ঞান রূপ বৃক্ষ = জ্ঞানবৃক্ষ
শোক রূপ অনল = শোকানল
শোক রূপ সাগর =
চিত্ত রূপ চকোর = চিত্তচকোর
চাঁদ রূপ মুখ = চাঁদমুখ
ফুল রূপ কুমারী = ফুলকুমারী
বিদ্যা রূপ ধন = বিদ্যাধন
জীবন রূপ স্রােত = জীবনস্রােত

চাঁদমুখ, চন্দ্রমুখ, মুখচন্দ্র

 

চাঁদমুখ

চাঁদ রূপ মুখ

রূপক কর্মধারয় (সূত্র: ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রণীত- বাঙ্গালা ব্যাকরণ)

চাঁদের মত/ন্যায় মুখ

  • উপমিত কর্মধারয়(সূত্র: ড. মুহাম্মদ এনামুল হক প্রণীত ব্যাকরণ মঞ্জরী)
  •  উপমিত কর্মধারয় (সূত্র: ড. হায়াৎ মামুদ প্রণীত- ভাষা শিক্ষা)
 

 

 

চন্দ্রমুখ

 

চন্দ্র রূপ মুখ রূপক কর্মধারয় সমাস
চন্দ্রের ন্যায় মুখ উপমিত কর্মধারয় (সূত্র: ড. হায়াৎ মামুদ প্রণীত- ভাষা শিক্ষা)
চন্দ্রের ন্যায় মুখ যার বহুব্রীহি সমাস (সূত্র: ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রণীত বাঙ্গালা ব্যাকরণ।
মুখ চন্দ্র মুখ চন্দ্রের ন্যায় উপমিত কর্মধারয় (সূত্র: ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রণীত বাঙ্গালা ব্যাকারণ।)
মুখ চন্দ্রের তুল্য উপমিত কর্মধারয় (সূত্র: ড.হায়াৎ মাহমুদ প্রণীত-ভাষা শিক্ষা)

 

  •  বিশেষনের সাথে বিশেষ্যও হয় কর্মধারয় সমাসে।
  •  কর্মধারয় সমাসে পরপদ প্রধান।
  •  সাধারণ গুণের উল্লেখ না করে উপমেয় পদের সাথে উপমানের উপমিত কর্মধারয় সমাস হয়।

আরো কয়েকটি কর্মধারয় সমাস

অব্যয় = কুকর্ম, যথাযোগ্য
সর্বনাম = সেকাল, একাল
সংখ্যাবাচক = একজন, দোতলা
উপসর্গ = বিকাল, সকাল, বিদেশ, বেসুর

দ্বিগু সমাস

সমাহার (সমষ্টি) বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
দ্বিগু সমাসে সমাস নিষ্পন্ন পদটি বিশেষ্য পদ হয় । দ্বিগু সমাসে পূর্বপদে সংখ্যাবাচক শব্দ (বিশেষন) ও উত্তরপদে বিশেষ্যযোগে সমাস হয়ে সমস্ত পদটি সমাহার বা সমষ্টিবাচক অর্থ প্রকাশ করে ।
দ্বিগু সমাসে পূর্বপদে দু(দুই), চতুঃ /চী(চার) , তে/ত্রি(তিন), পঞ্চ(পাঁচ),ষঢ়(ছয়), সপ্ত(সাত), নব(নয়) ইত্যাদি সংখ্যাবাচক বিশেষণ থাকে ।

উদাহরন:
তিন কালের সমাহার = ত্রিকাল
চৌরাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা
তিন মাথার সমাহার = তেমাথা
শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী
ত্রি (তিন) পদের সমাহার = ত্রিপদী
ত্রিফলের সমাহার = ত্রিফলা
সপ্ত ঋষির সমাহার = সপ্তর্ষি
পঞ্চবটের সমাহার = পঞ্চবটী
পঞ্চনদীর সমাহার = পঞ্চনদ(নদী নয়)
তে তলার সমাহার = তেতলা
চার অঙ্গের সমাহার = চতুরঙ্গ
সপ্ত অহের (দিবস) সমাহার = সপ্তাহ
তিন মোহনার মিলন = তেমোহনা
ছয় ঋতুর সমাহার = ষড়ঋতু
অষ্টধাতুর সমাহার = অষ্টধাতু
তের নদীর সমাহার = তেরনদী
সাত সমুদ্রের সমাহার = সাতসমুদ্র
পঞ্চ ভূতের সমাহার = পঞ্চভূত

বহুব্রীহি সমাস

যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোন পদকে বুঝায় তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। অর্থাৎ বহুব্রীহি সম সে পূর্বপদ বা পরপদ কোনটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোন তৃতীয় অর্থ প্রকাশ করে।
যেমন : বহুব্রীহি(ধান) আছে যার = বহুব্রীহি [এখানে ‘বহু’ বা ‘ব্রীহি’ কোনটিরই অর্থের প্রাধান্য নেই, যার বহুধান আছে এমন লোককে বুঝাচ্ছে।

  • বহুব্রীহি সমাসে সাধারণত যার, যাতে ইত্যাদি শব্দ ব্যাসবাক্য রূপে ব্যবহৃত হয়।
    উদাহরণ:
    আয়ত লোচন যার = আয়তলোচনা (স্ত্রী)
    মহান আত্মা যার = মহাত্মা
    স্বচ্ছ সলিল যার = স্বচ্ছসলিলা
    ইীল বসন যার = নীলবসনা
    স্থির প্রতিজ্ঞা যার = স্থিরপ্রতিজ্ঞ
    ধীর বুদ্ধি যার = ধীরুবুদ্ধি
  •  ‘সহ’ কিংবা ‘সহিত’ শব্দের সঙ্গে অন্য পদের বহুব্রীহি সমাস হলে ‘সহ’ ও ‘সহিত’ এর স্থলে ‘স’ হয়।

উদাহরণ :
বান্ধবসহ বর্তমান = সবান্ধব
সহ উদর যার =সহোদর>সোদর

 

  • বহুব্রীহি সমাসে পরপদে মাতৃ, পত্নী, পুত্র, স্ত্রী ইত্যাদি শব্দ থাকলে শব্দগুলোর সাথে ‘ক’ যুক্ত হয়।

উদাহরণ : নদী মাতা যার = নদীমাতৃক
বি(বিগত) হয়েছে পত্নী যার = বিপত্নীক

  • বহুব্রীহি সমাসে সমস্তপদে ‘ অক্ষি’ শব্দের স্থলে ‘ অক্ষ’ এবং ‘নাভি’ শব্দের স্থলে ‘নাভ’ হয়।

উদাহরণ :
কমলের ন্যায় অক্ষি যার = কমলাক্ষ
পদ্ম নাভিতে যার = পদ্মনাভ

  •  বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘জায়া’ শব্দের স্থানে ‘জানি’ হয় এবং পূর্বপদেও কিছু পরিবর্তন হয়।

উদাহরণ :
যুবতী জায়া যার = যুবজানি [ ‘যুবতী’ এর স্থলে ‘যুব’ আর ‘জায়া’ এর স্থলে জানি]

  • বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘চূড়া’ শব্দ সমস্ত পদে ‘চূড়’ এবং ‘কর্ম’ শব্দ সমস্ত পদে ‘কমা’ হয়।

উদাহরণ :
চন্দ্র চূড়া যার = চন্দ্রচূড়
বিচিত্র কর্ম যার = বিচিত্রকর্মা

  • বহুব্রীহি সমাসে ‘সমান’ শব্দের স্থানে ‘স’ এবং ‘সহ’ হয়।

উদাহরণ :
সমান কর্মী যে = সহকর্মী
সমান বর্ণ যার = সমবর্ণ
সমান উদর যাদের = সহোদর

  •  বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘গন্ধ’ শব্দ স্থানে ‘গন্ধি’ বা গন্ধা হয়।

উদাহরণ :
সুগন্ধ যার = সুগন্ধি
পদ্মের ন্যায় গন্ধ যার = পদ্মগন্ধি
মৎসের ন্যায় গন্ধ যার = মৎস্যগন্ধা

প্রকারভেদ

বহুব্রীহি সমাস আটপ্রকার :
১. সমানাধিকরণ
২. ব্যাধিকরণ
৩. ব্যতিহার
৪. নঞ
৫. মধ্যপদলোপী
৬. প্রত্যয়ান্ত
৭. অলুক
৮. সংখ্যাবাচক

সমানাধিকরণ বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদে বিশেষন ও পরপদে বিশেষ্য থাকে তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে।
উদাহরণ :
খোশ মেজাজ যার = খোশমেজাজ
হত হয়েছে শ্রী যার = হতশ্রী
হৃত হয়েছে সর্বস্ব যার = হৃতসর্বস্ব
নীল কন্ঠ যার = নীলকন্ঠ
পক্ব কেশ যার = পক্বকেশ
মন্দ্যভাগ্য যার = মন্দভাগ্য
লেজ কাটা যার = লেজকাটা

ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্ব বা পরপদ কোনোটিই সাধারণত বিশষন নয় (অন্যপদ)।
অর্থাৎ বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদ এবং পরপদ কোনটিই সাধারণত যদি বিশেষন না হয় তবে তাকে বলে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি।
উদাহরণ :
আশীতে বিষ যার = আশীবিষ
কথা সর্বস্ব যার = কথাসর্বস্ব
বীণা পাণিতে যার = বীণাপাণি
ক্ষনে জন্মে যার = ক্ষণজন্মা
দুই কান কাটা যার = দু কানকাটা
বোঁটা খসেছে যার = বোঁটাখসা
বজ্রতে দেহ যার = বজ্রদেহ
পদ্ম নাভিতে যার = পদ্মনাভ
ছা পোষা যার = ছাপোষা

ব্যাতিহার বহুব্রীহি

ক্রিয়ার পারস্পরিক অর্থে ব্যাতিহার বহুব্রীহি হয়। পরস্পর এক জাতীয় ক্রিয়া করা বোঝালে এ সমাস হয়। এ সমাসে পূর্বপদে ‘আ’ এবং উত্তরপদে ‘ই’ যুক্ত হয়।

উদাহরণ :
হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি
কানে কানে যে কথা = কানাকানি
ঘুষিতে ঘুষিতে যে লড়াই = ঘুষাঘুষি
লাঠিতে লাঠিতে যে যুদ্ধ = লাঠালাঠি
কেশে কেশে ধরে যে যুদ্ধ = কেশাকেশি
দেখায় দেখায় যে ক্রিয়া = দেখাদেখি
হাসিতে হাসিতে যে ক্রিয়া = হাসাহাসি

নঞ বহুব্রীহি

না অর্থবোধক অব্যয় যোগ করে বহুব্রীহি সমাস কার হলে তাকে নঞ বহুব্রীহি সমাস বলে। বিশেষ্য পূর্বপদের আগে নঞ (না অর্থবোধক) অব্যয় যোগ করে বহুব্রীহি সমাস করা হলে তা নঞ বহুব্রীহি সমাস।

উদাহরণ
নেই ভয় যার = নির্ভীক
নেই বোধ যার = নির্বোধ
ন (নাই) জ্ঞান যার = অজ্ঞান
বে (নই) হেড যার = বেহেড
চারা (উপায়) যার = নাচার
নি (নাই) ভুল যার = নির্ভুল
না (নয়) জানা যা = নাজানা/অজানা
নাই তার যার = বেতার
নাই বোধ যার = অবোধ
নাই ধর্ম যার = অর্ধম
নাই সুখ যার = অসুখ
নাই শংকা যার =নিঃশঙ্ক
বিগত পত্নী যার= বিপত্নীক
অক্ষরজ্ঞান নাই যার = নিরক্ষর
বে(নাই) ওয়ারিশ যার = বেওয়ারিশ

মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি

বহুব্রীহি সমাসের ব্যাখার জন্য ব্যবহৃত বাক্যাংশের কোন অংশ যদি সমস্তপদে লোপ পায় তবে তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে।

উদাহরণ :

চাঁদেও মতো মুখযার = চাঁদমুখো
সোনার মতো মুখ যার = সোনামুখী
বিড়ালের চোখের ন্যায় চো যে নারীর = বিড়ালচোখী
হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = হাতেখড়ি
নতুন ধানে অন্ন = নবান্ন
গোঁফে খেজুর পড়িয়া থাকলেও খায়না যে = গোফখেজুরে
দশবছর বয়স যার = দশবছুরে
কাঞ্চন বা সোনার মত প্রভা যার = কাঞ্চনপ্রভ
শূর্পের(কুলা) ন্যায় নখ যে নারীর = শূর্পণষা
কমলের মতো অক্ষি যার = কমলাক্ষ
 মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাসের আরো দুটি নাম হলো উপমাত্নক বহুব্রীহি ও ব্যাখ্যাত্নক বহুব্রীহি ।

প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয়যুক্ত হয় তাকে বলা হয় প্রত্যয়ান্ত্য বহুব্রীহি সমাস।

উদাহরণ : দুই দিকে টান যার = দোটানা
নেই খরচ যার = নিখরচে
ঘরের দিকে মুখ যার = ঘরমুখো
এক দিকে চোখ (দৃষ্টি) যার = একচোখা

অলুক বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্ব বা পরপদের কোনো পরিবর্তণ হয়না তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে। অলুক বহুব্রীহি সমাসে সমস্ত পদটি বিশেষণ হয়।
উদাহরণ :
মুখে ভাত (শিশুকে) দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = মুখেভাত
গায়ে হলুদ দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = গায়ে হলুদ।
মাথায় পাগড়ি যার = মাথায়পাগড়ি
গলায় গামছা যার = গলায়গামছা
হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = হাতে খড়ি।

সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদ বিশেষ্য হলে এবং সমস্তপদটি বিশেষন বুঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলা হয়। এ সমাসে সমস্তপদে ‘আ’ ‘ই’ বা ‘ঈ’ যুক্ত হয়।
 

উদাহরণ : তিন পায়া যার = তেপায়া
দুটি নল যার = দোনলা
দশ গজ পরিমান যার = দশগজি
চৌ (চার) চাল যে ঘরের = চৌচালা
দশ আনন যার = দশানন
দশ ভুজ (হাত) যার =দশভুজা
সহ¯্র লোচন যার = সহ¯্রলোচন
সে (তিন) তার যে যন্ত্রের = সেতার
চার হাত পরিমাণ যা = চারহাতি

সহার্থক বহুব্রীহি

অনেকে বহুব্রীহি সমাসের আর এক প্রকারের মান্য করেন। তাদের বিবেচনায় সহার্থক পূর্বপদের সঙ্গে বিশেষ্য উত্তরপদের বহুব্রীহি সমাস নিষ্পন্ন হলে তাকে সর্হাথক বহুব্রীহি সমাস বলে।

উদাহরণ :
সহ জাতি যার = সজাতি
স্ত্রীর সঙ্গে বর্তমান = সস্ত্রীক
শিষ্যের সহিত বর্তমান = সশিষ্য
কর্দমের সহিত বর্তমান = সকর্দম
জলের সহিত বর্তমান = সজল

নিপাতনে সিদ্ধ
কোনো নিয়মে ব্যাখা করা যায় না, অথচ বহুব্রীহি সমাস বলে গণ্য।

উদাহরণ :দুদিকে অপ যার = দ্বীপ
অন্তর্গত অপ যার = অন্তরীপ
সু (শোভন) হৃদয় যার যার = সুহৃদ
নিঃ (নাই)উপর যার = নিরুপায়
হায়া নাই যার = বেহায়া
নাই পরোয়া যার = বেপরোয়া
জীবিত থেকেও যে মৃত =জীবন্মৃত
পন্ডিত হয়েও মূর্খ = পন্ডিতমূর্খ
নরাকার যে পশু = নরাপশু

তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদের বিভক্তির লোপে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে।
এ সমাসে পূর্বপদে দ্বিতীয়া হতে সপ্তমী পর্যন্ত যে কোন বিভক্তি থাকতে পারে। আর পূর্বপদের বিভক্তি অনুসারে এদের নামকরণ হয়।

উদাহরণঃ
ধানের ক্ষেত = ধানক্ষেত
এখানে পরপদ ‘ক্ষেত’ প্রাধান্য পেয়েছে এবং সমাসবদ্ধ হওয়ার পর পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায়।

  • তৎপুরুষ সমাস নয় প্রকার।নি¤েœ এগুলোর প্রকারভেদ দেখানো হলোঃ

১) দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বা কর্ম তৎপুরুষ সমাস ঃ পূর্বপদের দ্বিতীয় বিভক্তি (কে,রে) ইত্যাদি লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে।

উদাহরণ :
দুঃখকে প্রাপ্ত = দুঃখপ্রাপ্ত
বইকে পড়া = বইপড়া
দেশকে ত্যাগ = দেশত্যাগ
পরলোকে গত = পরলোকগত
রথকে চালন = রথচালন
শরকে নিক্ষেপ = শরনিক্ষেপ
পুত্রকে লাভ = পুত্রলাভ
আমকে কুড়ানো = আমকুড়ানো
দেশকে ভঙ্গ = দেশভঙ্গ
পৃষ্ঠকে প্রদর্শন = পৃষ্ঠপ্রদর্শন।
জলকে সেচন = জলসেচন
দঃখকে অতীত = দুঃখাতীত
বিস্ময়কে আপন্ন = বিস্ময়াপন্ন
ব্যক্তিকে আপন্ন = ব্যক্তিগত
বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন
শরণকে আগত = শরণাগত
বয়ঃকে প্রাপ্ত = বয়ঃপ্রাপ্ত
সংখ্যাকে অতীত = সংখ্যাতীত
চিরদিন ধরে শত্রু = চিরশত্রু
দ্রতু যথা তথা গামী = দ্রতুগামী
স্বর্গকে প্রাপ্ত = স্বর্গপ্রাপ্ত
গাহায্যকে প্রাপ্ত = সাহায্যপ্রাপ্ত
কলাকে বেচা = কলাবেচা
শোককে অতীত = শোকাতীত
তপবনকে দর্শন = তপবনদর্শন
অর্ধ রুপে মৃত = অর্ধমৃত
ব্যপ্তি অর্থেও দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়।
উদাহরণ
চিরকাল ব্যাপিয়া সুখ = চিরসুখী
ক্ষণকাল ব্যাপিয়া ধারা = নিত্যধারা।
নিত্যকাল ব্যাপিয়া ধারা = নিত্যধারা

তৃতীয়া তৎপুরুষ বা করণ তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তির (দ্বারা, দিয়া, কতৃর্ক ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয়, তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়।
উদাহরণঃ
মন দিয়া গড়া = মনগড়া
শ্রম দিয়া লব্দ = শ্রমলব্ধ
মধু দিয়ে মাখা = মধুমাখা
বাক্ দ্বারা দত্তা = বাগদত্তা
মেঘ দ্বারা শূণ্য = মেঘশূণ্য
স্বর্ণ দ্বারা মন্ডিত = স্বর্ণমন্ডিত
জ্ঞান দ্বারা শূণ্য = জ্ঞানশূণ্য
এক দ্বারা ঊন = একোন
মধু দিয়ে মাখা = মধুমাখা
বাক দ্বারা বিতন্ডা = বাকবিতন্ডা
বিদ্যা দ্বারা হীন = বিদ্যাহীন
বায়ু দ্বারা চালিত = বায়ুচালিত
মাতৃ দ্বারা হীন = মাতৃহীন
মধু দ্বারা মাখা = মধুমাখা
কন্টক দ্বারা আকীর্ণ = কন্টকাকীর্ণ
ধন দ্বারা আঢ্য = ধনাঢ্য
শ্রম দ্বারা লব্ধ = শ্রমলব্ধ
ছায়া দ্বারা শীতল = ছায়াশীতল
অস্ত্র দ্বারা উপচার = অস্ত্রোপচার
পদ দ্বারা দলিত = পদদলিত
রব দ্বারা আহূত = রবাহূত
মাতৃ দ্বারা হীন = মাতৃহীন
বিদ্যা দ্বারা হীন = বিদ্যাহীন
বজ্র দ্বারা আহত = বজ্রাহত
ছায়া দ্বারা শীতল = ছায়াশীতল
ঢেঁকি দ্বারা ছাঁটা = ঢেঁকিছাঁটা
রক্ত দ্বারা অক্ত = রক্তাক্ত

** ঊন, হীন, শূণ্য প্রভৃতি শব্দ উত্তরপদ হলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়।
যেমন ঃ পাঁচ দ্বারা কম = পাঁচকম (একশ)

উপকরণবাচক বিশেষ্য পদ পূর্বপদে বসলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়।
যথাঃ স্বর্ণ দ্বারা মন্ডিত = স্বর্ণমন্ডিত

পূর্বপদে তৃতীয় বিভক্তি দ্বারা, দিয়া, কতৃর্ক ইত্যাদি লোপ না হলে অলুক তৃতীয় তৎপুরুষ সমাস।
উদাহরণ ঃ তেলে ভাজা = তেলেভাজা
কলে ছাঁটা = কলেছাঁটা

চতুর্থী তৎপুরুষ বা সম্প্রদান/নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি (কে, জন্য, নিমিত্ত ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলা হয়।
উদাহরণঃ
দেবকে দত্ত = দেবদত্ত
গুরুকে ভক্তি = গুরুভক্তি
বিয়ের জন্য (নিমিত্তে) পাগলা = বিয়েপাগলা
আরামের জন্য কেদারা = আরাম কেদারা
বসতের নিমিত্তে বাড়ি = বসতবাড়ি
পাঠের জন্য শালা = পাঠশালা
মাথার (চুলের) জন্য কাঁটা = মাথারকাঁটা
সেচনের নিমিত্তে কলস = সেচনকলস
মরেচের জন্য কান্না (নিমিত্তে)= মরাকান্না
শিশুদের জন্য বিভাগ = শিশুবিভাগ

পঞ্চমী তৎপুরুষ বা অপাদান তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে, চেয়ে ইত্যাদি) লোপে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলা হয়।

উদাহরণঃ
মুখ থেকে ভ্রষ্ট = মুখভ্রষ্ট
ঘর থেকে ছাড়া = ঘরছাড়া
বিলাত থেকে ফেরত = বিলাতফেরত
পরাণের চেয়ে প্রিয় = পরাণপ্রিয়
ইতি হতে আদি = ইত্যাদি
জেল থেকে মুক্ত = জেলমুক্ত
খাঁচা থেকে ছাড়া = খাঁচাছাড়া
কন্ঠ থেকে নিঃসৃত =কন্ঠনিঃসৃত
দেশ থেকে পলাতক = দেশপলাতক
জন্ম হতে অন্ধ = জন্মান্ধ
সত্য হতে ভ্রষ্ঠ = সত্যভ্রষ্ট
আগা হতে গোড়া = আগাগোড়া
প্রাণ হতে প্রিয় = প্রাণপ্রিয়
লোক হতে ভয় = লোকভয়
ঋণ হতে মুক্ত = ঋণমুক্ত
পদ থেকে চ্যুত = পদচ্যুত
ভদ্র হতে ইুর = ভদ্রতর
স্কুল হতে পালানো = স্কুলপালানো
বন্ধন থেকে মুক্ত = বন্ধনমুক্ত
স্বর্গ হতে ভ্রষ্ট = স্বর্গভ্রষ্ট
রোগ হতে মুক্ত = রোগমুক্ত
দল হতে ছুট = দলছুট
সর্ব হতে শ্রেষ্ঠ = সর্বশ্রেষ্ঠ
স্নাতক থেকে উল্টর = স্নাতকোত্তর
ধর্ম হতে ভ্রষ্ঠ = ধর্মভ্রষ্ঠ

 সাধারণত চ্যুত, আগত, ভীত, গৃহীত, বিরত, মুক্ত উত্তীর্ণ, পালানো, ভ্রষ্ট ইত্যাদি পরপদের সঙ্গে যুক্ত হলে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস হয়।
উদাহরণঃ স্কুল থেকে পালানো = স্কুলপালানো
জেল থেকে মুক্ত = জেলমুক্ত

 কোনো কোনো সময় পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাসের ব্যাসবাক্যে ‘এর’ ‘চেয়ে’ ইত্যাদি অনুসর্গের ব্যবহার হয়।
যেমন – পরাণের চেয়ে প্রিয় =পরাণপ্রিয়

ষষ্ঠী তৎপুরুষ বা সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদে ষষ্ঠী বিভক্তির (র,এর) লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে।

উদাহরণঃ
চায়ের বাগান = চাবাগান
রাজারপুত্র = রাজপুত্র
খেয়ার ঘাট = খেয়াঘাট
শ্বশুরের বাড়ি = শ্বশুরবাড়ি
বৃহতের পতি = বৃহস্পতি
কবিদের গুরু = কবিগুরু
অহেৃর পূর্বভাগ = পূর্বাহৃ
মাতার সেবা = মাতৃসেবা
পিতার ধন = পিতৃধন
ছাগীর দুদ্ধ =ছাগদুগ্ধ
যুদ্ধের উত্তর = যুদ্ধোত্তর
বনের পতি = বনস্পতি
ক্রোড়ের পত্র = ক্রোড়পত্র
কার্যের আলয় = কার্যালয়
গণের তন্ত্র = গণতন্ত্র
কর্ণের কুহর = কর্ণকুহর
তপস্বীর কণ্যা= তপস্বীকণ্যা
দূতের আবাস = দূতাবাস
বিদ্যার সাগর = বিদ্যাসাগর (টীকা: বিদ্যা রূপ সাগর; এটি কর্মধারয়ও বটে)
মালের গুদাম = মালগুদাম
ফুলের কুমারী = ফুল কুমারী (দ্রবষ্ট: উপমিত কর্মধারয়)
বিশ্বের ভারতী (বিদ্যা) = বিশ্বভারতী
জীবন সঞ্চার = জীবনসঞ্চার
পুষ্পের সৌরভ = পুষ্পসৌরভ
ভারের অর্পন = ভারার্পণ

 ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসে ‘রাজা’ ‘স্থলে’ ‘রাজ’ পিতা’ ‘মাতা’ ভ্রাতা স্থলে যথাক্রমে ‘পিতৃ’, ‘মাতৃ’ , ‘ভ্রাতৃ’ হয়।

উদাহরণঃ
গজনীর রাজা= গজনীরাজ
রাজার পুত্র =রাজপুত
পিতার ধন =পিতৃধন
মাতার সেবা= মাতৃসেবা
ভ্রাতার সেবা = ভ্রাতৃসেবা

 পরপদে সহ, তুল্য, নিভ, প্রায়, সম, এতিম এসব শব্দ থাকলেও ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস হয়।
উদাহরণঃ
পত্নীর সহ = পত্নীসহ
কণ্যা সহ = কণ্যাসহ
সহোদরের প্রতিম = সহোদর প্রতিম

কালের কোনো অংশবোধক শব্দ পরে থাকলে তা পূর্বে বসে।
উদাহরণঃ অহেৃর (দিনের) পূর্বভাগ = পূবাহ্ন

 পরপদে রাজি, গ্রাম, বৃন্দ, গণ, যূথ প্রভৃতি সমষ্টিবাচক শব্দ থাকলে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস হয়।

উদাহরণঃ
ছাত্রের বৃন্দ = ছাত্রবৃন্দ
গুণের গ্রাম =গুণগ্রাম
হস্তীর যূথ = হস্তীযূথ

 অর্ধ শব্দ পরপদ হলে সমস্তপদে তা পূর্বপদ হয়।
উদাহরণঃ
পথের অর্ধ = অর্ধপথ
দিনের আলো = অর্ধদিন

 শিশু, দুগ্ধ ইত্যাদি শব্দ পরে থাকলে স্ত্রীবাচক পূর্বপদ পুরুষবাচক ।
উদাহরণঃ
মৃগীর শিশু = মৃগশিশু
ছাগীর দগ্ধ = ছাগদুগ্ধ

 ব্যাসবাক্যে ‘রাজা’ শব্দ পরে থাকলে সমস্তপদে তা আগে আসে।
উদাহরণঃ
পথের রাজা = রাজপথ
হাঁসের রাজা = রাজহাঁস

অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসঃ

ঘোড়ার ডিম, মাটির মানুষ, হাতের পাঁচ, মামার বাড়ি, সাপের পা, মনের মানুষ, কলের ইত্যাদি।
 ভ্রাতার পুত্র = ভ্রাতুষ্পুত্র (নিপাতনে সিদ্ধ)

নঞ্ তৎপুরুষ সমাস

নাবাচক নঞ অব্যয় (না,নেই, নাই, নয়) পূর্বে বসে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলা হয়।
উদাহরণ ঃ
ন আচার = অনাচার
ন কাতর = অশাতর
ন কাল = অকাল বা আকাল
ন বিশ্বাস = অবিশ্বাস
ন অতিদীর্ঘ = নাতিদীর্ঘ
ন লৌকিক =অলৌকিক
বে (নয়) আইনি অ = বেআইনি
নয় পর্যাপ্ত = অপর্যাপ্ত
ন অতিবৃহৎ = অনতিবৃহৎ
ন মিল = অমিল
অনশন = ন অশন
নাই মিল = গরমিল
নাই জানা = অজানা

 খাঁটি বাংলায় অ,আ, না কিংবা অনা হয়।
উদাহরণঃ ন কাল = অকাল বা আকাল

না – বাচক অর্থ ছাড়াও বিশেষ বিশেষ অর্থে নঞ তৎপুরুষ সমাস হতে পারে। যথা –
অভাব – ন বিশ্বাস = অবিশ্বাস
ভিন্নতা – ন লৌকিক = অলৌকিক
অল্পতা – ন কেশা = অকেশা
বিরোধ – ন সুর = অসুর
অপ্রশস্ত – ন কাল = অকাল
মন্দ – ন ঘাট = অঘাট

উপপদ তৎপুরুষ সমাস

যে পদের পরবর্তী ক্রিয়ামূলের সঙ্গে কৃৎপ্রত্যয় যুক্ত হয় সে পদকে উপপদ তৎপুরুষ বলে।
কৃ দন্ত পদের সঙ্গে পদের উপপদের যে সমাস হয় তাকে বলে উপপদ তৎপুরুষ সমাস।

উদাহরণঃ
জলে চরে যা = জলচর
পঙ্কে জন্মে যা = পঙ্কজ
জল দেয় যে = জলদ
ধামা ধরে যে = ধামাধরা
প্রিয়ম্ বলে যে (নারী) = পিয়ংবদা
ক্ষীণভাবে বাঁচে যে = ক্ষীনজীবী
গৃহে থাকে যে = গৃহস্থ
জলে চরে যা = জলচর
সব হারিয়েছে যারা = সর্বহারা
পুথি পড়ে যে = পুথিপড়ো
কুম্ভ করে যে = কুম্ভকার
প্রভা করে যে = প্রভাকর
ছেলে ধরে যে = ছেলেধরা
বাজি করে যে = বাজিকর
একান্নে বর্তে যে = একান্নবর্তী
জাদু করে যে = জাদুকর
স্বর্ণ করে যে = স্বর্ণকার
হাড় ভাঙ্গে যাতে = হাড়ভাঙ্গা
বুক ভাঙ্গে যাতে = বুকভাঙ্গা
হালুই করে যে = হালুইকর
টনক নড়ে যাতে = টনকনড়া
পকেট মারে যে = পকেঁমার
ছা-পোষে যে = ছা-পোষা

অলুক তৎপুরুষ সমাস

যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের দ্বিতীয়াদি বিভক্তি লোপ হয়না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে।
উদাহরণঃ
গায়ে পড়া = গায়েপড়া

 গায়ে-হলুদ, হাতেখড়ি প্রভতি সমসÍপদে হয় না অর্থাৎ হলুদ বা খড়ি বোঝায় না, অনুষ্ঠান বিশেষকে বোঝায় না, অনুষ্ঠান বিশেষকে বোঝায়। সুতরাং এগুলোকে অলুক তৎপুরুষ নয়, অলুক বহুব্রীহি সমাস।

সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদ বিশেষ্য হলে এবং সমস্তপদটি বিশেষণ বোঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলা হয়। এ সমাসে ‘আ’ , ‘ই’ বা ‘ঈ’ যুক্ত হয়।
উদাহরণঃ দশ গজ পরিমাণ যার = দশগজি
চৌ (চার) চাল যে ঘরের = চৌচালা

অব্যয়ীভাব সমাস

পূর্বপদে অব্যয়যোগে নিষ্পন্ন সমাসে যদি অব্যয়েরই অর্থের প্রাধান্য থাককে তবে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। অব্যয়ীভাব সমাসে কেবল অব্যয়ীভাব সমাসে কেবল অব্যয়ের অর্থযোগে ব্যাসবাক্যটি রচিত হয়।
উদাহরণঃ
জানু পর্যন্ত লম্বিত = আজানুলম্বিত (বাহু)
মরণ পর্যন্ত= আমরণ

সামীপ্য, বিপসা (পৌনঃপনিকতা), পযর্ন্ত, অভাব, অনতিক্রম্যতা, সাদৃশ্য, যোগ্যতা প্রভৃতি নানা অর্থে অব্যয়ীভাব সমাস হয়।
সামীপ্য (উপ)
কন্ঠের সমীপে = উপকন্ঠ
কুলের সমীপে = উপকূল
ডবপসা (অনু, প্রতি)
দিন দিন = প্রতিদিন
ক্ষনে ক্ষনে = প্রতিক্ষনে/অনুক্ষণ
অভাব (নিঃ = নির)
আমিরের অভাব = নিরামিষ
ঋাবনার অভাব = নির্ভাবনা
জলের অভাব = নির্জল
উৎসাহের অভাব = নিরুৎসাহ
পর্যন্ত (আ)
সমুদ্র থেকে হিমাচল পর্যন্ত = আসমুদ্রহিমাচল
পা থেকে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক
সাদৃশ্য (উপ)
শহরের সদৃশ = উপশহর
গ্রহের তুল্য = উপগ্রহ
বনের সদৃশ = উপবন
অনতিক্রম্যতা (যথা)
রীতিকে অতিক্রম না করে = যথারীতি
সাধ্যকে অতিক্রম না করে =যথাসাধ্য
অতিক্রান্ত (উৎ)
বেলাকে অতিক্রান্ত = উদ্বেল
শৃঙ্খলাকে অতিক্রান্ত = উচ্ছৃঙ্খল
বিরোধ (প্রতি)
বিরুদ্ধ বাদ = প্রতিবাদ
বিরুদ্ধ কূল = প্রতিকূল
পশ্চাৎ (অনু)
পশ্চাৎ গমন = অনুগমন
পশ্চাৎ ধাবন = অনুধাবন
ঈষৎ (আ)
ঈষৎ নত = আনত
ঈষৎ রক্তিম = আরক্তিম
দূরবর্তী অর্থে (প্র, পর)
অক্ষির অগোচরে = পরোক্ষ

এছাড়াও কয়েকটি অপ্রধান সমাস রয়েছে
১. প্রাদি সমাসঃ প্র, প্রতি, অনু প্রভৃতি অব্যয়ের সঙ্গে যদি কৃৎ প্রত্যয় সাধিত বিশেষ্যের সমাস হয় তবে তাকে বলে প্রাদি সমাস।

উদাহরণঃ
প্র (প্রকৃষ্ট) যে বচন =প্রবচন
পরি (চতুর্দিকে) যে ভ্রমণ = পরিভ্রম
অনুতে (পশ্চাতে) যে তাপ = অনুতাপ
প্র (প্রকৃষ্ট রূপে) ভাত (আলোকিত) = প্রভাত
প্র (প্রকৃষ্ট রূপে) গতি = প্রগতি

. নিত্য সমাসঃ যে সমাসে সমস্যমান পদগুলো নিত্য সমাসবদ্ধ থাকে, ব্যাসবাক্যের দরকার হয়না তাকে নিত্যসমাস বলে।

উদাহরণঃ অন্য গ্রাম = গ্রামান্তর
কেবল দর্শন = দর্শনমাত্র
অন্য গৃহ = গৃহান্তর
(বিষাক্ত) কাল (যম) তুল্য (কাল বর্ণের নয়) সাপ = কালসাপ
তুমি, আমি ও সে = আমরা
দুই এবং নব্বই = বিরানব্বই
অন্য দেশ = দেশান্তর
অন্য গ্রাম = গ্রামান্তর