সুন্দরবনের ভৌগলিক অবস্থা ও ভূ-প্রকৃতি

 

সুন্দরবন বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে পুর্বে বলেশ্বর ও পশ্চিমে হাড়িয়াভাঙ্গা নদের মধ্যবর্তী অংশে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে অবস্থিত। এর মধ্যে তিনটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকা রয়েছে। খুলনা,বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার দক্ষিনে বঙ্গোপসাগরের তীরে সমুদ্র পৃষ্ঠের গড় উচ্চতার চেয়ে সুন্দরবনের ভূমি ০.৯ মিটার হতে ২.১১ মিটার উচু। সমগ্র বন এলাকায় প্রতিদিন দুই বার করে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। অত্র অঞ্চলের পানির লবণাক্ততা ঋতুভেদে এবং পুর্ব পশ্চিমের অবস্থান ভেদে তারতম্য হয়। বর্ষাকালে লবনাক্ততা হ্রাস পায় এবং শীতকালে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়।

লবণাক্ততার মাত্রার উপর ভিত্তি করে সুন্দরবন-কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে যথা-মিষ্টি/স্বাদু পানি এলাকা, মধ্যম লবনাক্ত পানি এলাকা এবং লবনাক্ত পানি এলাকা। সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চল বাংলাদেশ বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণাধীন। এ অঞ্চলের আওতায় দু’টি বন বিভাগ রয়েছে, যা সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ ও সুন্দরবন পুর্ব বন বিভাগ নামে পরিচিত। দাকোপ,পাইকগাছা, কয়রা,শ্যামনগর উপজেলার ৩,৫৭,৩৪১ হেঃ এলাকা সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন এবং দাকোপ, মংলা, মোড়লগঞ্জ, শরনখোলা উপজেলার ২,৪৩,১৪৭ হেঃ এলাকা সুন্দরবন পুর্ব বন বিভাগের আওতাধীন। উক্ত বন বিভাগ দু’টির সদর দফতর যথাক্রমে খুলনা ও বাগেরহাটে এবং রেঞ্জ সদর নলিয়ান,বুড়িগোয়ালিনী,চাঁদপাই, শরনখোলায় অবস্থিত। দু’টি বন বিভাগের অধীনে চারটি ফরেষ্ট রেঞ্জ রয়েছে যা শরণখোলা, চাঁদপাই,খুলনা ও সাতক্ষীরা।

সতেরটি ষ্টেশন এবং বাহাত্তরটি টহল ফাঁড়ি/ক্যাম্প বিদ্যমান।সুন্দরবন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় আটটি ওয়ার্কিং সার্কেল রয়েছে যা সুন্দরী ওয়ার্কিং সার্কেল, গেওয়া ওয়ার্কিং সার্কেল, জ্বালানী কাঠ ওয়ার্কিং সার্কেল, গোলপাতা ওয়ার্কিং সার্কেল, বন্য প্রাণী ও চিত্ত বিনোদন ওয়ার্কিং সার্কেল, জলজ সম্পদ ওয়ার্কিং সার্কেল, কেওড়া ওয়ার্কিং সার্কেল ও মিশ্র ওয়ার্কি সার্কেল নামে অভিহিত।

সুন্দরী ওয়ার্কিং সার্কেল :

সুন্দরী গাছের আধিক্য সম্পন্ন বনাঞ্চল যথা শরনখোলা, চাঁদপাই ও খুলনা রেঞ্জ সমন্বয়ে এই সার্কেল গঠিত। আনুমানিক ব্যাপ্তি ২,৩১,১৫৯ হেঃ। উল্লেখ্য যে, সুন্দরীকাঠ আহরনে সুন্দরবনের প্রকৃত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রায় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ। প্রতিবছর জেলেদের দ্বারা সুন্দরী খুটি কর্তন, নদীর ভাঙ্গন, অবৈধ চোরা কাঠ পাচারকারীদের দ্বারা সুন্দরী কাঠ অপসারণ ইত্যাদি বিষয় গুলির দিকে নজর রেখে আহরণ মাত্রা সীমিত রাখা হয়েছে। যাতে প্রতি বছর উল্লেখিত সুন্দরী কাঠ আহরনের ফলে বনের গ্রোয়িং ষ্টক কোন ভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হতে না পারে। সুন্দরীর কাঠের সাথে মিশ্রিত কেওড়া ও অন্যান্য প্রজাতির কাঠের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য।

গেওয়া ওয়ার্কিং সার্কেল :

গেওয়া গাছ সমৃদ্ধ ২,৯৬,৬৯৮ হেঃ বনাঞ্চল। এই ওয়ার্কিং সার্কেল শুধুমাত্র খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলে গেওয়া কাঠ সরবরাহের জন্য বিশেষভাবে চিহ্নিত ছিল। সুন্দরবন হতে বছরে ১৮ লক্ষ ঘনফুট গেওয়া কাঠ আহরণ করা সম্ভব। পরিকল্পিত পন্থায় নিয়মিত গেওয়া কাঠ আহরিত না হলে বনের উৎপাদন ক্ষমতা লোপ পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। বন্য প্রাণী অভয়ারন্যকে এই সার্কেলের কর্মকান্ড বহির্ভুত রাখা হয়েছে।

জ্বালানী কাঠ ওয়ার্কিং সার্কেল :

এই ওয়াকিং সার্কেলটি নৃতন ভাবে সংযোজন করা হয়েছে। বন্যপ্রানী অভয়ারন্য এলাকা এবং স্বল্প ষ্টক সম্মৃদ্ধ ১১টি কম্পার্টমেন্ট বাদে সুন্দরবনের অবশিষ্টাংশ এই সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত। জ্বালানী আহরণযোগ্য এলাকার পরিমান ২,০২,২০৭ হেঃ। জ্বালানী কাঠ হিসাবে গড়ান প্রজাতির অবস্থান সর্বশীর্ষে এবং সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে গড়ান কাঠের আধিক্য দেখা যায়। এলাকা ভিত্তিতে গড়ান আহরনের ব্যবস্থাপনায় বার্ষিক আহরণ মাত্রা ১০,১১০ হেঃ নির্ধারণ করা আছে। সুন্দরবণ পুর্ব বন বিভাগ হতে বছরে প্রায় ২ লক্ষ মন গড়ান জ্বালানী আহরণ করে বনের উৎপাদন ক্ষমতা সঠিক রাখা সম্ভব।

গোলপাতা ওয়ার্কিং সার্কেল :

সমগ্র সুন্দরবনে বিস্তৃত গোলপাতা সমৃদ্ধ নদী ও খালের স্ট্রীপ সমন্বয়ে এ সার্কেল গঠিত। বিদ্যমান ষ্টক ও অতীত রেকর্ডের ভিত্তিতে বার্ষিক আহরণ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নির্ধারণ মাত্রা অনুযায়ী সুন্দরবন পুর্ব বন বিভাগ হতে গোলপাতা আহরনের লক্ষমাত্রা প্রায় ২৬,০০০ মেঃ টন। অভয়ারন্য সমুহ হতে গোলপাতা আহরনের জন্য ভিন্ন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা আছে।

বন্য প্রাণী ও চিত্ত বিনোদন ওয়ার্কিং সার্কেলঃ

সুন্দরবনের বিদ্যমান ৩টি বন্য প্রাণী অভয়ারন্য সমন্বয়ে এ সার্কেল গঠিত। এই সার্কেলে বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত সকল প্রকান বনজ আহরণ নিষিদ্ধ আছে। অবশ্য অভয়ারন্যের বাহিরে চিত্ত বিনোদন ও বন্য প্রাণীর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সমুহ এ সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত।

জলজ সম্পদ ওয়ার্কিং সার্কেল :

বন্য প্রাণী অভয়ারন্য ছাড়া সুন্দরবনের অবশিষ্ট জলাভূমির সমন্বয়ে এ সার্কেল গঠিত। মাছ, কাকড়া, ঝিনুক ইত্যাদি আহরনের বিষয়ে কিছু বিধি নিষেধ এ সার্কেলের ব্যবস্থাপনায় সংযোজন করা আছে।

কেওড়া ওয়ার্কিং সার্কেল :

কেওড়া প্রজাতির অধিকতর ঘনত্ব সম্পন্ন বনাঞ্চল সমন্বয়ে এ সার্কেল গঠিত। সুন্দরী ওয়ার্কিং সার্কেলের সাথে নদী ও খালের পাড় সংলগ্ন ও নুতন চরের একক কেওড়া প্রজাতির বনে এই সার্কেলের ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা প্রযোজ্য। এই প্রজাতির আহরণ সর্বনিম্ন ১৫.০০ সেঃমিঃ নির্ধারণ করা আছে।

মিশ্র ওয়ার্কিং সার্কেল :

অভয়ারন্য ব্যতীত সমগ্র সুন্দরবনের এলাকা জুড়ে এ সার্কেলের ব্যাপ্তি। এ সার্কেলের অধীনে বনের অন্যান্য অপ্রধান বনজ দ্রব্য যেমন মধু, মোম, হেতাল, মালিহা ঘাষ, সন, বলা জ্বালানী ইত্যাদি আহরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সমগ্র সুন্দরবন হতে বছরে ১০০০ মেঃটন হেতাল, ৪৭০০ মেঃটন ঘাস, ১৩০ টন মধু আহরনের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারিত আছে। এ সার্কেলের অধীনে শুকনো মওসুমে দুবলা জেলে পল্লীতে জেলেদের অস্থায়ী ঘর নির্মানের ব্যবস্থা করা হয়েছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *