অনুজীব

অনুজীব

 

ভাইরাস

 

ভাইরাস একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ বিষ। ভাইরাস হলো অতি আনুবীক্ষণিক, অকোষীয় রাষায়ানিক বস্তু যা প্রোটিন ও নিউক্লিক এসিড দ্বারা গঠিত। ভাইরাসের দেহে নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম নেই। পোষক দেহের অভ্যন্তরে সক্রিয় হয় এবং সংখ্যা বৃদ্ধি করে। পোষক দেহের বাইরে জড় পদার্থের ন্যায় আচরণ করে। জীব ও জড় পদার্থের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী গল ভাইরাস। যে সকল ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে তাদেরকে বলা হয় ব্যাকটেরিওফাজ।

 

ভাইরাসঘটিত রোগ

ক. উদ্ভিদের দেহে রোগ: ভাইরাস তামাকের মোজাইক রোগ, ধানের টংগ্রো রোগের জন্য দায়ী।

খ. প্রানীদেহের রোগ

করোনা ভাইরাস: বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। এটি চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে উৎপত্তি বলে ধরে নেওয়া হয়।

 

রোগের নাম জীবানুর নাম সংক্রমণের মাধ্যম
করোনা নভেল করেনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯  
গুটি বসন্ত (Smallpox) Variola বায়ু
জল বসন্ত (Chickenpox) Varicella বায়ু
ইনফ্লুয়েঞ্জা (Flu) Influenza Virus বায়ু
হংকং ভাইরাস SARS Virus বায়ু
হাম Measles Virus বায়ু
মাম্পস Mumps Virus বায়ু
পোলিও Polio myelitis দূষিত খাদ্য ও পানি
জন্ডিস (Jaundice) Hepatitis Virus যৌন, রক্ত, দূষিত খাদ্য ও পানি
এইডস(AIDS) HIV Virus যৌন, রক্ত
বার্ড ফ্লু (Bird Flu) H5N1 হাস, মুরগী, কবুতর, পাখি
সোয়াইন ফ্লু (Swine Flu) H1N1 শুকুর
জলাতঙ্ক (Street Virus) Rabies Virus কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বানরসহ হিংস্র প্রাণী
ইবোলা (Ebola) Ebola Virus বানর, বাদুড়
ডেঙ্গু   এডিস মশা
হার্পিস Herpes simplex ছোয়াচে
রানীক্ষেত বা নিউক্যাসেল Avula Virus Paramyxoviridae  
নিপাহ Nipah Virus বাদুড়, শুকুর, কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বানর

 

হার্পিস রোগের চিকিৎসায় এসিক্লোভার (Acyclover) নামক ঔষুধ ব্যবহৃত হয়।

করোনা ভাইরাস: বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। এটি চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে উৎপত্তি বলে ধরে নেওয়া হয়।

নিপাহ ভাইরাস: নিপাহ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায় মালয়েশিয়ায় ১৯৯৯ সালে। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য কিছু বিষয় অনুসরণ করা উচিত। যেমন-

১. খেজুরের কাঁচা রস পান না করা।

২. গাছ থেকে যে কোন ধরনের  আংশিক ফল ভক্ষন না করা।

৩. ফলমূল পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালভাবে ধৌত করা।

৪. আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসলে পানি দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে।

 

ইবোলা ভাইরাস (Ebola Virus): মধ্য আফ্রিকার উত্তরাংশে কঙ্গো উপত্যকায় প্রবাহিত ইবোলা নদীর নামানুসারে এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়। ১৯৭৬ সালে কঙ্গোতে সর্বপ্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। ইবোলা ভাইরাস এর লক্ষণ জ্বর, গলা ব্যথা, পেশী ব্যথা এবং মাথা ধরা। ইবোলা ভাইরাসে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশ লাইবেরিয়া।

সোয়াইন ফ্লু (Swine Flu) : সোয়াইন ফ্লুতে সর্বপ্রথম আক্রান্ত হয় মেক্সিকোর শিশু এদগার হার্নান্দেজ। বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী সনাক্ত হয় ১৮ জুন ২০০৯। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সোয়াইন ফ্লুর নাম পরিবর্তন করে রাখে Influenza A.

ইনফ্লুয়েঞ্জা (Influenza): ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সুপ্তবস্থা অত্যন্ত কম।

 

SARS (Severe acute respiratory syndrome):

২০০২ সালে চীনে সর্বপ্রথম সার্স ভাইরাস ধরা পড়ে।

 

এইডস : মানবদেহে HIV (Human Immunodeficiency Virus)এর আক্রমণে এইডস  (AIDS=Acquired Immune Deficienvy Syndrome) রোগ হয়। এইডস রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের শ্বেতকণিকা ধ্বংস হয়। ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  (Immunity) লোপ পায়। HIV সংক্রমণের সর্বশেষ পর্যায় হলো এইডস। মানবদেহে HIV ভাইরাস প্রবেশের ৬ মাস থেকে ১০ বছরের মধ্যে শরীরে এইডস এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। এইডস রোগের কোনো লক্ষণ নেই। পেনিসিলিন বা অন্য কোনো এন্টিবায়োটিকে দ্বারাই AIDS রোগ সারানো সম্ভব নয় অর্থাৎ এইডস এর এখনো পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা নেই।  এইডস রোগীর সাধারণ  স্পর্শেই দ্বরা এ রোগ ছড়ায় না। রক্ত সঞ্চালন, যৌন সংগমের মাধ্যমে এ রোগ সংক্রমিত হয়। গর্ভবতী মহিলা এ রোগে আক্রান্ত হলে তার সন্তানেরও এ রোগ হতে পারে। স্তনদুগ্ধ পানের ফলে আক্রান্ত মহিলার থেকে শিশুর AIDS রোগ হতে পারে। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা AIDS সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এইডস প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা। প্রতিবছর ১লা ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। ১৯৮০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের প্রথম ‘এইডস’ রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি এইডস আক্রান্ত রোগী আছে।

 

পোলিও: পোলিও ভাইরাস স্নায়ুকে আক্রমণ করে।এর ফলে অঙ্গ অবশ বা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হতে পারে। পোলিওতে শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

 

ডেঙ্গুজ্বর: বাংলাদেশে বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রকোপ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডেঙ্গs ফিভার ভাইরাস (Flavivirus) জিনের Flavivirdae পরিবারের একটি RNA ভাইরাস। ডেঙ্গুজ্বর ভাইরাসের বাহক মশা এডিস এজিপটাই (Aedes aegypti) । উচ্চজ্বর, পেশি-হাড়-মাথা ব্যথা, র‌্যাশ, শরীরের বিভিন্ন স্থান হতে রক্তপাত হওয়া ডেঙ্গজ্বরের লক্ষণ।

 

ভেক্টর: যে সকল প্রাণী এক মানবদেহ থেকে অন্য মানব দেহে রোগ জীবানু বহন করে নিয় যায় তাদেরকে ভেক্টর বলে। যেমন মশা একটি ভেক্টর।

 

বাহক রোগ বাহক রোগ
এডিস মশা ডেঙ্গু জ্বর কিউলেক্স মশা ফাইলেরিয়া বা গোদ
এনোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া বাদুড় নিপাহ/ করোনা

 

জিকা ভাইরাস

১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা বনে সর্বপ্রথম এই ভাইরাসের প্রার্দুভাব দেখা যায়, ফলে বনের নামানুসারে এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়। এটি একটি মশাবাহিত ভাইরাস। এই ভাইরাসটি এডিস প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়। জ্বর, মাথা ব্যাথা, চোখ লাল, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি রোগের প্রধান লক্ষণ। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে এই ভাইরাশের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

 

ভাইরাসঘটিত রোগের প্রতিষেধক

রোগের নাম টীকার আবিষ্কারক দেশ সময়কাল
জলাতঙ্ক লুই পাস্তুর ফ্রান্স ১৮৮৫
পোলিও জোনাস সক যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৪
বসন্ত এডওয়ার্ড জেনার যুক্তরাজ্য ১৭৯৬

 

  • ১৯৯৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের La Jolla শহরে মারা যান।

 

ব্যাকটেরিয়া

বিজ্ঞানী লিউয়েন হুক ১৬৭৫ সালে ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করেন। ব্যাকটেরিয়া

আদি নিউক্লিয়াসযুক্ত, অসবুজ, এককোষীয় আণুবীক্ষণিক জীব। যে সকল ব্যাকটেরিয়া

অক্সিজেনের উপস্থিতি ছাড়া বাচতে পারেনা তাদেরকে এরোবিক ব্যাকটেরিয়া বলে। যে সকল ব্যাকটেরিয়া বায়ুর উপস্থিতি ছাড়া বেঁচে থাকে তাদের এনারোবিক ব্যাকটেরিয়া বলে। যে সব অনুজীব রোগ সৃষ্টি করে তাদেরকে প্যাথজেনিক বলা হয়। প্রাণিদেহে জীবানুজাত বিষ নিষ্ক্রিয়কারী রাসায়নিক পদার্থের নাম এন্টিবডি।

 

ব্যাক্টেরিয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব

শীম জাতীয় উদ্ভিদে Rhizobium ব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজেনকে নাইট্রেট পরিণত করে। আমাদের অন্ত্রে Escherichia coli  ব্যাকটেরিয়া থাকে। শুকনো মাধ্যমে খাবার সংরক্ষণ করা যায় কারণ পচনকারী জীবাণু পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না। নিষ্পিষ্ট মসলায় লবণ মিশিয়ে অনেকদিন রাখা যায় করাণ লবণ পচনকারী জীবাণুর বংশ বিস্তার রোধ করে।

 

পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization)

দুধে ল্যাক্টোজেন থাকে। দুধের ব্যাকটেরিয়া ল্যাক্টোজকে র‌্যাকটিক এসিডে পরিণত করে। ফলে দুধ টক হয়। দুধকে জীবানুমুক্ত করার প্রক্রিয়াকে পাস্তুরায়ন বলে। ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর এ প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। আবিষ্কারকের নামানুসারে এ পদ্ধতির নামকরণকরা হয় পাস্তুরায়ন। আমরা দইয়ের সাথে এক ধরনের প্রচুর ব্যাকটেরিয়া খাই।

 

ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ

ব্যাকটেরিয়া গরু মহিষের যক্ষ্মা, ভেড়ার এনথ্রাক্স, ইদুরের প্লেগ এবং মুরগির কলেরা ইত্যাদি রোগ সৃষ্টি করে। ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের গমের টুন্ডুরোগ, ধানের ব্লাইটম আখের আঠাঝড়া রোগ, টমেটোর ক্যাংকার, আলুর পচা রোগ, ভূট্টার বোটা পচা রোগ ইত্যাদি সৃষ্টি করে।

ব্যাকটেরিয়া মানুষের বহুবিধ রোগ সৃষ্টি করে। যেমন:

 

রোগের নাম রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকিটেরিয়ার নাম রোগ বিস্তারের মাধ্যম
যক্ষ্মা Mycobbacterium tuberclosis বায়ু
নিউমোনিয়া Streptococcus pneumoniae বায়ু
ডিপথেরিয়া Corynebacterium diptheriae বায়ু
হুপিংকাশি Bordetella pertussis বায়ু
মেনিনজাইটিস Neisseria meningitidis বায়ু
গনোরিয়া Neisseria gomorrhoeae যৌন
সিফিলিস Treponema pallidum যৌন
টাইফয়েড Salmonella typhi খাদ্য, পানি
প্যারাটাইফয়েড Salmonella paratyphi খাদ্য, পানি
কলেরা Vibrio cholerae খাদ্য, পানি
রক্ত আমাশয় Shigella dysenteriae খাদ্য, পানি
কুষ্ঠ/লেপ্রোসি Mycobacteriumleprae দীর্ঘদিন রোগীর সংস্পর্শে
ধনুষ্টংকার Clostirdium tetani ক্ষতস্থান দিয়ে
প্লেগ Yersenia pestis ইঁদুর
এনথ্রাক্স Bacillus anthracis আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে

 

  • রবার্ট কচ যক্ষ্মা এবং কলেরার জীবাণূ আবিষ্কার করেন।
  • ডিপথেরিয়া রোগে দেহের গলা আক্রান্ত হয়।
  • এনথ্রাক্স শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ হতে।

ব্যাকটেরিয়া হতে প্রতিষেধক তৈরি করা হয়।যেমন-

 

রোগ টীকার নাম টীকার আবিষ্কারক
যক্ষ্মা B.C.G ক্যালসাট ও গুয়েচিন
ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার

 

D.P.T  
ধনুষ্টংকার T.T  

 

 

পরজীবী

 

যে সকল জীব অন্য জীবের ভিতর বা বাহিরে সব সময় বা সাময়িকভাবে অবস্থান করে এবং পুষ্টির জন্য সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে আশ্রয়দাতা জীবের উপর নির্ভর করে তাদেরকে পরজীবী বলে। আশ্রয়দাতা জীবকে পরজীবীর পোষক বলে। পরজীবী দুই প্রকার। যথা –

ক) বহিঃপরজীবী : এরা পোষক দেহের বাহিরে অবস্থান করে। যেমন- উঁকুন, জোঁক।

খ) অন্তঃপরজীবী: এরা পোষক দেহের ভিতরে অবস্থান করে। যেমন- ম্যালেরিয়া জীবাণু, ক্রিমি।

 

ম্যালেরিয়া

‘ম্যালেরিয়া’ শব্দটি ফ্রেন্স ভাষা হতে আগত। ম্যালেরিয়া শব্দের অর্থ দূষিত বাতাস। টর্টি সর্বপ্রথম ‘ম্যালেরিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেন। বিজ্ঞানী চার্লস ল্যাভেরন ম্যালেরিয়া জীবাণু আবিষ্কার করেন। Plasmodium নামক প্রোটোজোয়া ম্যালেরিয়া রোগের জন্য দায়ী। মেজর রোনাল্ড রস সর্বপ্রথম বলেন, ‘স্ত্রী এনোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া জীবাণু বহন করে।ম্যালেরিয়া ঔষুধ ‘কুইনিন’ সিঙ্কোনা গাছ থেকে পাওয়া যায়।

ফাইলেরিয়া (গোদ রোগ)

গোদ রোগের জন্য দায়ী ফাইলেরিয়া ক্রিমি। বৃহত্তর দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে ফাইলেরিয়া রোগের প্রকোপ বেশি।