মুক্তিযুদ্ধ ও অভূদ্যয়

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

 

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ

 

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর বাঙ্গালীদের আন্দোলন দুর্বল করতে জয়দেবপুরের দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী সৈন্যদের কৌশলে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে তাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু মুক্তিকামী বাঙ্গালী সৈন্য এবং স্থানীয় জনতা তাদের মতলব বুঝতে পেরে অস্ত্র জমা না দিয়ে চাঁন্দনা মোড় থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্থানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এভাবেই সর্বপ্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে জয়দেবপুর তথা গাজীপুরের বীর জনতা।

১৫ ফেব্রয়ারি ১৯৪৮ সালে মেজর আবদুল গণি এ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন।

 

২৫ মার্চের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা – অপারেশন সার্চ লাইট

 

পাকিস্থানি সৈন্যরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে যে গণহত্যামূলক অভিযান চালিয়েছিল তার নাম দিয়েছিল ‘অপারেশ সার্চ লাইট’।

 

অপারেশন বিগ বার্ড

 

অপারেশন  ব্লিজ ও অপারেশ সার্চ লাইটের কোথাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সরাসরি ছিলোনা। তবে পাক সেনাদের এসব অপারেনে ‘বিগ বার্ড, নামে বঙ্গবন্ধুর একটি কোড নাম ছিল।বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্থানের হাতে বন্দী করার প্রক্রিয়ার নামই ছিল অপারেশন বিগ বার্ড।

 

স্বাধীনতার ঘোষণা

 

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। পৃথিবীতে দুটি দেশে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল – একটি বাংলাদেশ এবং অন্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

২৫ মার্চ, ১৯৭১ রোজ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২ নং বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ওইদিন দিনের বেলা যে কোন জরুরি ঘোষণা প্রচারের উপলক্ষে তিনি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রকৌশলী নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নং বাসভবনে একটি ট্রান্সমিটার স্থাপন করেন বলে আওয়ামী লীগ সূত্রে উল্লেখ আছে। বন্দি হবার পূর্বে মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং এ ঘোষণা ওয়ারলেস যোগে চট্টগ্রামে প্রেরণ করেন। পরের দিন বিবিসির প্রভাতী অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি প্রচারিত হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিকস বা জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয়। ১৯৭১ সালে ২৬ মাচের দুপুরে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি প্রচার করেন। ২৭ মার্চ, ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান নিজে এবং পরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের মুজিবনগরে (বৈদ্যনাথতলা) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।

 

১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ ১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে জিপে  তুলে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই রাতে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয় ক্যান্টনমেন্টে আদমজী স্কুলে। ২৬ মার্চ দিনের বেলায় তাকে ফ্লাগ হাউজে নেওয়া হয়। তিনদির পর বিমানযোগে তাকে পাকিস্থান নিয়ে যাওয়া হয়।

 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

 

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ মধ্যরাতে দেশের সকল রেডিও স্টেশন পাকিস্থানি সৈন্যদের নিয়ন্ত্রনে চলে যায়। চট্টগ্রামের কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতার উদ্যোগে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে প্রেরণ করা হয় এবং কালুরঘাট কেন্দ্রিক বেতার কেন্দ্র গড়ে তোলা হয় এবং নাম দেওয়া হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’। ১৯৭১ সালের ২৮শে এপ্রিল মেজর জিয়ার অনুরোধে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকে বিপ্লবী  শব্দটি বাদ দিয়ে নামকরণ করা হয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। ১৯৭১ সালের ৩০ শে মার্চ হানাদার বিমান বাহিনীর বোমা বর্ষণের ফলে বেতার কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে যায়। একই বছর ২৫শে মে কলকাতর বালিগঞ্জে বেতার কেন্দ্রটি ২য় পর্যায়ের সম্প্রচার শুরু হয়।

 

স্বাধীন বাংলা বেতারের অতন্ত্য জনপ্রিয় দুইটি অনুষ্ঠান ছিলো ‘চরমপত্র’ ও ‘জল্লাদের দরবার’। ‘জল্লাদের দরবার’ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অমানবিক চরিত্র ও পাশবিক আচরণকে ‘কেল্লা ফতেহ খান’ চরিত্রের মাধ্যমে চিত্রিত করা হয়েছে। চরমপত্র সিরিজটির পরিকল্পনা করেন জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল মান্নান এবং ঢাকাইয়া ভাষায় এর স্ত্রিপ্ট লেখা হত ও তাঁর উপস্থাপনা করেন এম আর আকতার মুকুল।

 

মুজিবনগর সরকারের গঠন ও কার্যাবলি

 

মুজিবনগর সরকার:

মুক্তিযুদ্ধের গতিময় ও সুসংহত করার জন্য, ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালীর দেখাশুনা এবং বাঙ্গালী জাতির ভাবমূর্তিকে তুলে ধরার জন্য ‘প্রবাসী সরকার’ গঠনের চিন্তা ভাবনা শুরু হয়।   ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ঘোষিত হয় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার আদেশ’। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের ঘোষণা অনুযায়ী স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী  সরকার গঠন করা হয়। এ সরকারের প্রধান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তার নাম অনুসারে বৈদ্যনাথ তলার নতুন নাম হয় ‘মুজিবনগর’ আর অস্থায়ী সরকার পরিচিত হয় ‘মুজিব নগর সরকার’ নামে।এ সরকার ‘প্রবাসী সরকার’ ও ‘অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার’ নামে পরিচিত। বালাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী করা হয় মুজিবনগরকে, আর অস্থায়ী সচিবালয় স্থাপিত হয় কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে।

 

মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দ

 

 

ব্যক্তির নাম পদবি ও দায়িত্ব
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি
সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ- রাষ্ট্রপতি (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি)
তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী/প্রতিরক্ষামন্ত্রী
এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী
এ. এইচ.এম. কামরুজ্জামান

 

স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী
খন্দকার মোস্তাক আহমদ পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী
কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী প্রধান সেনাপতি
গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার

 

উপসেনাপ্রধান ও বিমান বাহিনীর প্রধান
   

 

মেহেরপুর ছিল তখন হানাদারমুক্ত ও মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। মেহেরপুরের ভবের পাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে বহু দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা এবং আইন সভার সদস্যদের উপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল ‘মুজিব নগর সরকার’ শপথ পাঠ করেন।স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র পাঠ করেন আইনসভার সদস্য ও আওয়ামীলীগের প্রখ্যাত নেতা  অধ্যাপক ইউসুফ আলী। এই স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র কার্যকর হয় ১৯৭১ সালে ২৬ শে মার্চ থেকে। তিনি মন্ত্রীপরিষদের শপথ বাক্যও পাঠ করান।

 

সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি

প্রবাসী সরকারের উপদেশ ও পরামর্শ  প্রদানের জন্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী) মাওলানা আব্দুল হামিদ ভাসানী, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (মোজাফফর) অধ্যাপক মোঃ মোজাফফর আহমেদ, কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মনি সিং, কংগ্রেসের শ্রী মনোরঞ্জন এবং আওয়ামী লীগের ৫ জনপ্রতিনিধি নিয়ে সর্বমোট ৯ সদস্য বিশিষ্ট্র  একটি ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠিত হয়। এই উপদেষ্টা কমিটির প্রধান ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ ভাসানী।

লন্ডন, নিউইয়র্ক, স্টকহোম ও কলকাতায় মিশন খোলা হয়।এ দূতাবাসগুলো বাংলাদেশের পক্ষে বর্হিবিশ্বে বিশেষ দূত ছিলেন অধ্যাপক আবু সাইদ চৌধুরী।

 

মুজিবনগর সরকারের সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিশোধ

 

নাম পরিচিতি
মাওলানা আব্দুল হামিদ ভাসানী সভাপতি-ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী)
কমরেড মনি সিংহ সভাপতি-বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি
অধ্যাপক মোঃ মোজাফফর আহমেদ সভাপতি-ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ- মোজাফফর)
শ্রী মনোরঞ্জন ধর সভাপতি-বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেস
তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী – বাংলাদেশ সরকার
খন্দকার মোস্তাক আহমদ পররাষ্ট্র – বাংলাদেশ সরকার

 

মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল

 

তেলিয়াপাড়া রণকৌশল: ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় পাকিস্থান সেনাবাহিনী, ইস্ট পাকিস্থান রাইফেলস, আনসার ও পুলিশ বাহিনীর উচ্চপদস্থ বাঙ্গালী সদস্যরা এক বৈঠকে মিলিত হয়ে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। এ সভাতেই মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী বাহিনী সম্পর্কিত সাংগঠনিক ধারণা এবং কমান্ড কাঠামোর রূপরেখা প্রণীত হয়।

 

মুক্তিযুদ্ধের সামরিক প্রশাসনঃ

মুক্তিবাহিনী সরকারী পর্যায়ে দুইভাগে বিভক্ত ছিল। যথা-নিয়মিত বাহিনী ও অনিয়মিত বাহিনী।

 

নিয়মিত বাহিনী

সেক্টর ট্রুপস: প্রধান তাজউদ্দিন আহমেদের নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানী সুষ্ঠভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সমগ্র যুদ্ধ ক্ষেএকে ১১টি সেক্টরে এবং ৬৪টি সাব-সেক্টরে ভাগ করেন।প্রতিটি সেক্টরের দায়িত্ব একজন কমান্ডারের উপর ন্যস্ত করা হয়।

 

বিগ্রেড ফোর্স:  ১১টি সেক্টর ও অনেকগুলো সাবসেক্টর ছাড়াও রণাঙ্গনকে তিনটি বিগ্রেড ফোর্সে বিভক্ত করা হয়। ফোর্সের নামকরণ করা হয় অধিনায়কদের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে।

জেড ফোর্স : মেজর জিয়াউর রহমান

এস  ফোর্স : মেজরকে এম শফিউল্লাহ

কে ফোর্স : মেজর খালেদ মোশারফ

 

অনিয়মিত বাহিনী

এ বাহিনীতে ছিল ছাত্র ও যুবকেরা। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য এদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এদেরকে ফ্রিডম ফাইটারর্স (এফ.এফ) বলা হয়, আর সরকারি নাম ছিল অনিয়মিত বাহিনী বা গণবাহিনী।

 

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর এলাকা

 

সেক্টর এলাকা
চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ফেনী নদী পর্যন্ত
নোয়াখালী এবং কুমিল্লা, ঢাকা ও ফরিদপুর জেলার অংশ বিশেষ
হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং কুমিল্লা ও ঢাকা জেলার অংশ বিশেষ
সিলেট জেলার অংশ বিশেষ
জেলার অংশবিশেষ এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী অঞ্চল
রংপুর ও দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও মহাকুমা
রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া জেলা এবং ঠাকুরগাঁও ছাড়া দিনাজপুরের অবশিষ্ঠ অংশ
কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, যশোর এবং ফরিদপুর ও খুলনার অংশ বিশেষ
খুলনা ও ফরিদপুর জেলার অংশ বিশেষ এবং বৃহত্তর বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা
১০ এ সেক্টরের অধীনে ছিল নৌ কমান্ডোরা। সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল এবং অভ্যন্তরীন নৌপথ ছিল এই সেক্টরের অধীনে
১১ কিশোরগঞ্জ জেলা ব্যতিত ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা

 

 

অপারেশন জ্যাকপট

 

১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট পরিচালিত নৌ কমান্ডো বাহিনীর প্রথম অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’ । পাকিস্থান হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে নৌপথে সৈন্য ও অন্যান্য সরঞ্জাম নৌ পথে আনা নেওয়া করতো। এ জন্য এই ১৫ আগস্ট রাতে নৌ-কমান্ডোরা একযোগে মংলা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী, নারায়নগঞ্জ আক্রমণ করে এবং নৌ-কমান্ডোরা প্রায় ১২৬টি জাহাজ, কোস্টার, ফেরি নষ্ট করে বা ডুবিয়ে দেয়।অক্টোবর ও নবেম্বর মাসেও এরকম কয়েকটি অপারেশ চালিয়ে পাকিস্থানের সমুদ্রগামী ও উপকূলীয় জাহাজ বন্দরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

 

মুক্তিফৌজ: ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল মুক্তিফৌ গঠন করা হয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭১ সালে নামকরণ করা হয় মুক্তিবাহিনী।

 

সেক্টর কমান্টারদের পরিচয়

 

সেক্টর সেক্টর কমান্টারদের
মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল-জুন)

মেজর রফিকুল ইসলাম (জুন-ডিসেম্বর)

মেজর খালেদ মোশারফ (এপ্রিল- সেপ্টেম্বর)

মেজর এটি এম হায়দার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর)

মেজর কে এম শফিউল্লাহ(এপ্রিল-সেপেম্বর)

মেজর নুরুজ্জামান (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর)

মেজর সি আর দত্ত, ক্যাপ্টেন এ রব
মেজর মীর শওকত আলী
উইং কমান্ডার এম কে বাশার
মেজর নাজমুল হক, জের এ রব, মেজর কাজী নুরুজ্জামান
মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (এপ্রিল-অক্টোবর)

মেজর আবুল মনছুর (আগস্ট-ডিসেম্বর)

মেজর আবদুল জলিল

এম এ মঞ্জুর (অতিরিক্ত দায়িত্ব)

১০ মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিংপ্রাপ্ত নৌ কমান্ডারগণ যখন সেক্টরে কাজ করেছেন তখন সেসব কমান্ডারগণের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করেছেন। নৌবাহিনীর ৮ জন বাঙ্গালী কর্মকর্তা সেক্টর পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীন ছিলেন ১০নং সেক্টরের একজন কর্মকর্তা।
১১ মেজর আবু তাহের (এপ্রিল-নভেম্বর)

ফ্লাইট লেঃ এম হামিদুল্লাহ (নভেম্বর-ডিসেম্বর)

 

মুক্তিযুদ্ধে সম্মানসূচক খেতাব

 

স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইউনিট, সেক্টর, বিগ্রেড থেকে পাওয়া খেতাবের জন্য সুপারিশসহ এয়ার মার্শাল এ.কে খন্দকারের নেতৃত্বে একটি কমিটি দ্বারা নিরীক্ষা করা হয়। এরপর ১৯৭৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব খেতাব তালিকায় স্বাক্ষর করেন।১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বরের পূর্বে নির্বাচিতসকল মুক্তিযোদ্ধাদের নামসহ মোট ৬৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিম্নোক্ত খেতাব প্রদান করা হয়:

 

বীরশ্রেষ্ঠ – ৭ জন

বীর উত্তম -৬৮ জন

বীর বিক্রম – ১৭৫ জন

বীর প্রতীক – ৪২৬ জন

 

১৯৯২ সালের  ১৫ ডিসেম্বর জাতীয়ভাবে বীরত্বসূচক খেতাব প্রাপ্তদের পদক ও রিবন প্রদান করা হয়। ২০০১ সালের ৭ মার্চ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক পুরস্কার এবং সনদপত্র প্রদানকরা হয়।

বাহিনীভিত্তিক খেতাবপ্রাপ্তদের সংখ্যা:

সেনাবাহিনী -২৮৮ জন

নৌবাহিনী  – ২৪ জন

বিমান বাহিনী – ২১ জন

বাংলাদেশ রাইফেলস – ১৪৯ জন

পুলিশ – ৫ জন

মুজাহিদ/আনসার – ১০ জন

গণবাহিনী – ১৭৫ জন

খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছে দুইজন মহিলা। পাঁচজন অবাঙালিও বীরত্বসূচক খেতাব পান যাদের মধ্যে একজন বিদেশি।

বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে ৩ জন সেনাবাহিনীর, ১ জন নৌবাহিনীর, ১ জন বিমানবাহিনীর এবং ২ জন ইপিয়ারের।

 

মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র আদীবাসী বীর বিক্রম ইউ কে চিং মারমা।

 

বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র বিদেশী মুক্তিযোদ্ধ ডব্লিউ এস ওয়ান্ডারল্যান্ড। তিনি ১৯১৭ সালে নেদারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। ২০০১ সালে তিনি মারা যান।

 

স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবপ্রাপ্ত দুইজন মহিলা হলেন ‘তারামন বিবি’ (১১ নং সেক্টর) ও ‘ক্যাপ্টেন ডা. সেতারা বেগম’ (২নং সেক্টর)।

মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনা ও গুপ্তচর-কাকন বিবি (খাসিয়া সম্প্রদায়ে জন্ম)। আসল নাম কাকন হেনইজঞ্জিতা। স্বাধীনতার আগে তিনি এক মুসলমানকে বিয়ে করে ইসলাম গ্রহণ করেণ। নাম হয় কাকন ওরফে নূরজাহান। স্বামী মজিদ আলী ছিলেন ইপিআর সৈনিক। সিলেটের কাকন বিবি ‘মুক্তিবেটি’ নামে পরিচিত।১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে বীর প্রতীক উপাধীতে ঘোষিত করলেও আজও তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি।

 

সর্বকনিষ্ট খেতাবপ্রাপ্ত  ‍মুক্তিযোদ্ধা – শহীদুল ইসলাম লালু (বীর প্রতীক)।

 

উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ খেতাবপ্রাপ্ত বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ (কর্ণেল জামিল নামেই পরিচিত)। তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেহরক্ষী হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থা নিহত হন। তাই তাকে ২০১০ সালে মরণোত্তর বীরউত্তম খেতাবে ঘোষিত করা হয়।তাই মক্তিযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর উত্তম ৬৮ জন। কিন্ত মোট খেতাবপ্রাপ্ত বীর উত্তম ৬৯ জন।

 

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য লেফটেনেন্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোজাফফর আহমেদ কে বীর বীক্রম খেতাব দেওয়া হয়।তাই  ‍মুক্তিযুদ্ধে ১৭৫ জন বীর বীক্রম খেতাব পেলেও  মোট বীর বীক্রম খেতাবপ্রাপ্ত ১৭৭ জন।

 

বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা

২০১৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৩২২ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধাকে

স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে।

 

 

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশীদের অবদান

 

বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা পান ১জন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা দেওয়া হয় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা পান ১৫ জন। মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা পায় ৩১২ জন ও ১০টি সংগঠন।

 

মুক্তিযুদ্ধে নিহত বিদেশী নাগরিক হলেন ইতালির মারিও ভেরেনজি। তিনি ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল মারা যান।

 

সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ পরিচিতি

 

 

১. বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ

জন্ম: ১৯৪৩ সালে ফরিদপুর জেলাতে।

কর্মস্থল : ই.পি. আর (আস্ট পাকিস্থান রাইফেল)

পদবী : ল্যান্স নায়েক

সেক্টর : ১ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

মৃত্যু: ৭ এপ্রিল, ১৯৭১ [সূত্র: বাংলাপিডিয়া]

    ৮ এপ্রিল, ১৯৭১ [সূত্র: বাংলাএকাডেমি চরিতাভিধান]

    ২০ এপ্রিল, ১৯৭১ [সূত্র: মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়]

সমাধি স্থল: রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়া চর

 

২. বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল

 

জন্ম: ১৯৪৯ সালে ভোলা জেলাতে।[সূত্র: মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়]

    ১৯৪৭ সালে ভোলা জেলাতে।[সূত্র: বাংলাপিডিয়া]

কর্মস্থল : সেনাবাহিনী

পদবী : সিপাহী

সেক্টর : ২ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

মৃত্যু: ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ [সূত্র: বাংলাপিডিয়া]

    ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ [সূত্র: মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়]   

সমাধি স্থল: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়ার মোগরা গ্রামে।

 

৩. বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান

 

জন্ম: ১৯৪৯ সালে ঢাকা জেলাতে।

কর্মস্থল : বিমানবাহিনী

পদবী : লেফটেন্যান্ট

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্থানে কর্মরত ছিলেন। পাকিস্থান বিমান বাহিনীর একটি টি-৩৩ প্রশিক্ষন বিমান (ছদ্মনাম-‘ব্লু বার্ড’) ছিনতাই করে নিয়ে দেশে ফেরার পথে তার সহযোগী পশ্চিম পাকিস্থানী পাইলট রাশেদ মিনহাজের সাথে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং তিনি নিহত হন)

মৃত্যু: ২০ আগস্ট, ১৯৭১

সমাধি স্থল: পাকিস্থানের করাচির মৌরিপুর মাশরুর ঘাটিতে ছিল তাঁর সমাধিস্থল। ২০০৬ সাওলের ২৩ জুন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্থান হতে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁকে পূর্ণ মর্যাদায় ২৫ জুন মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়।

 

 

৪. বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ

 

জন্ম: ১৯৩৬ সালে নড়াইল জেলাতে।

কর্মস্থল : ই.পি. আর (আস্ট পাকিস্থান রাইফেল)

পদবী : ল্যান্স নায়েক

সেক্টর : ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

মৃত্যু: ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

সমাধি স্থল: যশোরের শর্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে।

 

 

৫. বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান

 

জন্ম: ১৯৫৩ সালে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খালিশপুরে।

কর্মস্থল : সেনাবাহিনী

পদবী : সিপাহী

সেক্টর : ৪ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

মৃত্যু: ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১ । তিনি হলেন সর্বকনিষ্ট বীরশ্র্রেষ্ট মুক্তিযোদ্ধা।

সমাধি স্থল: প্রথমে সমাধি ছিলো ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলন এর একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ গ্রহণ করেন। ১১ ডিসেম্বর তাঁকে পূর্ণ মর্যাদায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়।

 

 

৬. বীরশ্রেষ্ঠ স্কোয়াড্রন ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন

জন্ম: ১৯৩৫ সালে নোয়াখালী জেলাতে।

কর্মস্থল : নৌবাহিনী

পদবী : স্কোয়াড্রন ইঞ্জিনিয়ার।

সেক্টর : ২নং এবং ১০ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

মৃত্যু: ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ [সূত্র: মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়]   

     ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ [সূত্র: বাংলাপিডিয়া]

সমাধি স্থল: খুলনার রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামে রূপসা নদীর তীরে।

 

৭. বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর

 

জন্ম: বরিশাল জেলাতে ১৯৪৯ [সূত্র: মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়]   

                ১৯৪৮ [সূত্র: বাংলাপিডিয়া]

কর্মস্থল : নৌবাহিনী

পদবী : স্কোয়াড্রন ইঞ্জিনিয়ার।

সেক্টর : ৭নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

মৃত্যু: ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। বীরশ্রেষ্টদের মধ্যে সর্বশেষ শহীদ হন।

সমাধি স্থল: চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ প্রাঙ্গনে।

 

মুক্তিবাহিনীর কোন গেরিলা দলের সদস্য

 

শহীদ শাফি ইমাম রুমী ছিলেন জাহানারা ইমামের একমাত্র সন্তান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকায় কয়েকটি গেরিলা অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পাকিস্থানিদের হাতে ধরা পড়েন এবং নিখোঁজ হন। জাহানারা ইমামকে তাঁর পুত্রের মহান আত্মত্যাগের জন্য ‘শহীদ জননী’ বলা হয়।

 

 

বুদ্ধিজীবী হত্যা

 

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ঠিক পূর্ব মুহুর্তে বাংলাদেশের  স্বাধীনতা অনিবার্য হয়ে পড়লে পাকিস্থানি হানাদার ও তাদের মিত্র আলবদর ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাঙ্গালীর তৎকালীন শ্রেষ্ঠ সন্তান তথা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা বরে এক কলঙ্গময় ইতিহাসের সৃষ্টি করেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য – ডাঃ ফজলে রাব্বী, ডাঃ আলীম চৌধুরী, দার্শনিক জিসি দেব, সুরকার আলতাফ মাহমুদ, রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, শহীদুল্লাহ কায়সার, সাহিত্যিক মুনীর চৌধুরী, সাহিত্যিক আনোয়ার পাশা, জ্যোর্তিময় গুহ ঠাকুরতা, সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, ডাঃ সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ।

 

পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়

 

২১ নভেম্বর, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথ কমাণ্ড গঠন করে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী (ভারতের সেনাবাহিনী) সমন্বয় এটি গঠিত। ৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পাকিস্থান বিমানবাহিনী ভারতের বিমান ঘাটিতে হামলা চালালে সেদিনই তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম জেলা হিসেবে যশোর শত্রুমুক্ত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) বাংলাদেশ ও ভারতের সম্মিলিত মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের দিন আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার।

 

অন্যান্যঃ

  • বাংলা এ পর্যন্ত দুই বার বিভক্ত হয়। প্রথমবার ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে এবং দ্বিতীয় বার ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের ফলে।
  • ঢাকা এ পর্যন্ত পাঁচবার বাংলার রাজধানী হয়। প্রথমবার ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান সুবা বাংলার রাজধানী করেন ঢাকাকে। দ্বিতীয়বার ১৬৬০ সালে সুবেদার মীর জুমলা ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী করেন। তৃতীয়বার ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী করেন ঢাকাকে। চতুর্থবার পাকিস্থান সরকার পূর্ববাংলার রাধানী করেন ঢাকাকে এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে ঘোষনা করেন।

 

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

 

‘The Concert for Bangladesh’ হলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশের শরনার্থীদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন প্রাঙ্গনে দি ব্রিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন এবং ভারতীয় সেতারবাদক পণ্ডিত রবি সংকর কর্তৃক আয়োজিত দাতব্য সঙ্গীতানুষ্ঠান। সঙ্গীতানুষ্ঠানটি আয়োজিত হয় ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট। এই সঙ্গীতানুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীদের এক বিশাল দল অংশ নিয়েছিলেন যাদের মধ্যে বব ডিলান, এরিক ক্লাপটন, লিয়ন রাসেল, বিলি প্রিস্টন, ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁর, লিয়ন রাসেল, ব্যাড ফিঙ্গারের নাম উল্লেখযোগ্য। কনর্সাট ও অণ্যান্য অনুষঙ্গ থেকে প্রাপ্ত অর্থ সাহায্যের পরিমাণ ছিলো প্রায় ২,৪৩,৪১৮,৫১ মার্কিন ডলার, যা ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সাহায্যার্থে ব্যয়ীত হয়।

** বব ডিলান ২০১৬ সালে ১৩ অক্টোবর সুইডিস একাডেমী তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেন।তিনি পৃথিবীর প্রথম গীতিকার যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অদ্যাবধি তাঁর বিক্রিত রেকর্ডের সংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি।

 

 

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশিদের অবদান

 

** ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্থানে পাকিস্থানে পাকিস্থানি বর্বরতার খবর সর্বপ্রথম বহির্বিশ্বে প্রকাশ করেন সাইমন ড্রিং।

** স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহের কবিতা পাঠের আয়োজন করেন রাশিয়ার ইয়েভগেনি ইয়েস তুসোস্কোর এবং ভারতের এলেন গিনেসবার্গ। এলন গিনেসবার্গ বাংলাদেশী শরণার্থীদের করুণ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামক কবিতা রচনা করেন।

** ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন ইন্দিরা গান্ধী। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ প্রথম রাষ্ট্রীয় অথিতি হিসেবে তিনি প্রথম বাংলাদেশে আসেন। তার আগে আর কোন বিদেশি রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান বাংলাদেশে আসেননি।

** রাশিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়ন) এবং ভারত মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেন। অন্য দিকে আমেরিকা এবং চীন মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নেন। আমেরিকার মূল ভূখন্ডের বাইরে সবচেয়ে বড় নেভাল ফোর্সের নাম ‘সপ্তম নৌবহর’। বরন প্রধান ঘাঁটি জাপানের ইয়াকোসুকা। আমেরিকার সবচেয়ে  এবং শক্তিশালী জাহাজগুলো সপ্তম নৌ বহর থাকে।১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় নিশ্চিত দেখে আমেরিকা জাতিসংঘকে ব্যবহার করে পাকিস্থানের পক্ষে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে চায়। কিন্তু রাশিয়ার বিরোধিতায় জাতিসংঘকে ব্যবহারে তারা ব্যর্থ হয়ে একতরফা শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে সপ্তম নৌবহরের বেশির ভাগ জাহাজ ভিয়েতনামের কাছকাছি ছিল।১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহরে কয়েকটি জাহাজ নিয়ে ‘টার্স্কফোস ৭৪’ গঠিত হয়। জাহাজগুলো সিঙ্গাপুরে একত্রিত হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা করে।এই বহরের প্রধান জাহাজ ছিলো ‘ইউএসএ এন্টারপ্রাইজ’  যা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী (৭০ টির বেশি যুদ্ধ বিমান ছিল) জাহাজ।ঐ জাহাজে নিউক্লিয়ার বোমাও (৭৫০০০ টন পারমানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন) ছিলো।কিন্তু সোভিয়েতের পাল্টা ধাওয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রয়াস ব্যর্থ হয় এবং তার পিছু হটে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করে।